Healthy Lifestyle স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রারোগ ও ব্যাধি Health Condition

ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির উপায়:  Ways to Treat Depression Naturally Without Medication 

হতাশা ও বিষণ্ণতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। বিষণ্ণতা থেকে মুক্তি পেতে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে ওষুধ ছাড়াও আমরা বিষণ্ণতার মোকাবেলা করতে পারি। প্রতিদিনের ছোট ছোট প্রচেষ্টা, বিষণ্ণতা ও হতাশা দূর করতে বেশ কার্যকর হতে পারে। এই প্রতিবেদনে ডিপ্রেশন অর্থাৎ বিষণ্ণতা থেকে মুক্তির প্রাকৃতিক উপায় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

যারা বিষণ্ণতা ও হতাশায় ভোগেন, সেই সকল ব্যক্তিরা সাধারণত যা কিছু ভুল তা নিয়ে চিন্তা করে। ভবিষ্যতে হতে পারে এমন সব নেতিবাচক সম্ভাবনা সম্পর্কে অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা করে। এই ধরনের নেতিবাচক চিন্তা দুঃখ কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়, ফলে হতাশা ও বিষণ্ণতা বেড়ে যায়।

বর্তমান মুহূর্তের উপর মনোযোগ দিতে পারলে এই সমস্যা কমে। “Live in Present” অর্থাৎ বর্তমানকে নিয়ে ভাবলে বিষণ্ণতা কমে। বর্তমান সময়ে মনোযোগ দেওয়ার জন্য অনুশীলন করার প্রয়োজন হতে পারে। আমাদের জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলি পূর্ণরূপে ব্যবহার করতে হবে। স্পর্শ, স্বাদ, দৃষ্টি, শব্দ ও গন্ধের উপর মনোযোগ দিতে হবে। ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য অনুভূতিগুলিকে গুরুত্ব দিলে বিষণ্ণতার জন্য সময় কম থাকে ও আমরা বর্তমান মুহূর্তকে উপভোগ করতে পারি। এর ফলে মনের মধ্যে নেগেটিভ ভাবনা আসার সুযোগ পায় না, তাই মনোযোগ দেওয়ার অনুশীলন করা দরকার।

ঘুম ও মেজাজ একে অপরের সাথে সম্পর্কযুক্ত। ঘুম ভালো হলে মেজাজ ভালো থাকে। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন। ভালো ঘুম মানে প্রতিদিন সঠিক সময় ঘুমানো, সঠিক সময় ঘুম থেকে ওঠা এবং ঘুমের মাঝে ব্যাঘাত না ঘটা। আরামদায়ক ঘুমের জন্য আপনার শোবার ঘরটা শান্ত, পরিচ্ছন্ন ও অন্ধকার হওয়া দরকার। ঘুমানোর আগে নিজেকে শান্ত করুন,আরামদায়ক কিছু করুন ও চাপ পূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলুন। আমাদের ঘুমের উপর আলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের চক্র অর্থাৎ সারকোডিয়ান ছন্দ ঠিক রাখতে দিনের বেলা পর্যাপ্ত সূর্যালোকে থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে প্রতিদিন আধ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে কম তীব্রতার ব্যায়াম করা দরকার। শ্বাস-প্রশ্বাস, প্রাণায়াম ইত্যাদি আমাদের মনকে শান্ত রাখতে দারুণ কার্যকরী। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে শারীরিক কসরত, হতাশা ও বিষণ্ণতা দূর করতে বেশ ভালো কাজ করে। সমস্যা হল, বিষণ্ণ মনে ব্যায়াম করতে ভালো লাগেনা। এক্ষেত্রে একজন বন্ধুর সাহায্য নিন বা কোন ব্যায়ামাগার ভর্তি হতে পারেন। আপনার প্রিয়জনরা সাহায্য করলে অবশ্যই ব্যায়াম করতে ভালো লাগবে। ছোট করে শুরু করতে হবে, পরে ধীরে ধীরে ব্যায়ামের মাত্রা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। প্রতিদিন কিছুটা সময় হাঁটার চেষ্টা করুন, পরে হাঁটার পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে।

চা, কফি, ঠাণ্ডা পানীয় এবং চকলেটে প্রচুর পরিমাণ ক্যাফেইন থাকে। ক্যাফেইন আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, কিন্তু অতিরিক্ত ক্যাফিন গ্রহণ করলে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে। সকালের দিকে ক্যাফেইন গ্রহণ করা ভালো, কিন্তু বিকেলের পর ক্যাফেইন গ্রহণ করা উচিত নয়। বিকেলের পর ক্যাফেইন জাতীয় খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। ক্যাফেইন এর প্রতি আকর্ষণ বেশি থাকলে সেটা বিষণ্ণতা ও হতাশা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ক্যাফেইন সেবন ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে হবে। কফির প্রতি আকর্ষণ হলে অল্প একটু হাঁটার চেষ্টা করুন, নেশা চলে যাবে।

অ্যালকোহল নিজেই একটি বিষণ্ণতা ও হতাশা সৃষ্টিকারী পানীয়। মদ্যপান ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে ও শরীরকে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে মানসিক সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। অ্যালকোহল পান আমাদের বেশি আবেগী করে তোলে ও সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ এবং খারাপ সিদ্ধান্তের দিকে চালিত করতে পারে। যারা হতাশা দূর করার ওষুধ খান তাদের কোন মতেই অ্যালকোহল পান করা উচিত নয়, কারণ অ্যালকোহল ওষুধের প্রভাব নষ্ট করে দেয়। অ্যালকোহলের নেশা ছাড়তে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

গবেষণায় জানা গিয়েছে যে দেহে ভিটামিন D এর অভাব হলে হতাশা ও বিষণ্ণতার সমস্যা বাড়তে পারে। দেহে ভিটামিন D এর মাত্রা ঠিক রাখতে সকাল বেলা সূর্যালোকে কম করে 30 মিনিট থাকতে হবে। এই সময় ত্বকে সরাসরি লাগলে সবচেয়ে ভালো ভিটামিন D উৎপন্ন হয়। হাত, পা, পিঠ ইত্যাদি উন্মুক্ত রেখে রোদ পোহানো বেশি কার্যকর। এছাড়া ভিটামিন D যুক্ত খাদ্য যেমন ডিমের কুসুম, সামুদ্রিক মাছ, দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য, সরষের তেল, অলিভ অয়েল ইত্যাদি গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে ভিটামিন D যুক্ত সম্পূরক খাদ্য বা ওষুধ গ্রহণ করা যেতে পারে।

আমরা খাদ্য হিসাবে কী গ্রহণ করছি তার দ্বারা আমাদের চিন্তাভাবনা ও অনুভূতি প্রভাবিত হয়। সকল সময় পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ সুষম খাদ্য গ্রহণ করা উচিত, কারণ বেশ কিছু খাদ্য আছে যা আমাদের বিষণ্ণতার মাত্রা কমাতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, যারা মাছ বেশি খান তাদের মধ্যে বিষণ্ণতা বা হতাশা কম দেখা যায়। মাছের মধ্যে ওমেগা -3 ফ্যাট বেশি থাকে, যা মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নামক তৃপ্তিদায়ক রাসায়নিকের ক্ষরণে সাহায্য করে। বাদাম জাতীয় খাদ্যের মধ্যেও প্রচুর পরিমাণ ওমেগা 3 ফ্যাট পাওয়া যায়। যারা আখরোট খান তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বেশ কম। এছাড়া প্রবায়োটিক অর্থাৎ উপকারী জীবাণুযুক্ত খাদ্য যেমন দই, আচার, পনির, লস্যি ইত্যাদিও বিষণ্ণতা কমাতে সাহায্য করে।

বিষণ্ণতার সমস্যা দূর করতে আধ্যাত্মিকতার অনুশীলন দারুণ একটা উপায়। উপাসনা, ধ্যান ইত্যাদি সাধারণ দৈনন্দিন কাজ আমাদের মনকে প্রশান্ত করতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, ধ্যান বা মেডিটেশন বিষণ্ণতা ও হতাশার চিকিৎসায় দারুণ কার্যকর। ধ্যান করার জন্য শান্তভাবে আরাম করে বসুন, চোখ বন্ধ করুন, স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিন। এবার মন কে স্থির করে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে মনোযোগ স্থাপন করুন। কপালের সামনে একটি কাল্পনিক আলোর বিন্দু বা কাল্পনিক প্রদীপের শিখায় মনোযোগ স্থাপন করুন। এছাড়া আপনার সম্পূর্ণ শরীর রোগমুক্ত বলে মনে করুন।

সংগীতকে মানুষের দেহ ও মনের জন্য প্রশান্তি দায়ক বলা যেতে পারে। দার্শনিক ও গণিতবিদ পিথাগোরাস মিউজিক থেরাপি ব্যবহার করতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আহত সৈনিকদের মানসিক চিকিৎসায় মিউজিক থেরাপি ব্যবহার করা হতো। মিউজিক থেরাপির ফলাফল যথেষ্ট ইতিবাচক। মিউজিক থেরাপি নেওয়ার জন্য একটি হেড-ফোন ব্যবহার করে সংগীত শুনতে হবে। আপনার পছন্দের যেকোনো সংগীত শুনতে পারেন, তবে মনকে শান্ত করার জন্য সাধারণত ধীর লয়ে যন্ত্র সঙ্গীত বা শাস্ত্রীয় সংগীত ব্যবহার করা হয়। এছাড়া প্রকৃতির বিভিন্ন প্রাকৃতিক শব্দ যেমন ঝর্ণা, পাখির কলতান ইত্যাদিও ব্যবহার করা হয়।

বাড়ি বা অফিসের পরিবেশে গাছপালা থাকলে আমাদের মন শান্ত থাকে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, কর্মক্ষেত্রে গাছপালা থাকলে কাজ করতে ভালো লাগে। যারা বাড়িতে গাছপালার সংস্পর্শে বসবাস করেন তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে। আরেকটা গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, যাদের ঘরে ইনডোর প্ল্যান্ট থাকে তাদের মানসিক সমস্যা কম হয়। একারণে বিষণ্ণতা দূর করতে অফিসে ও বাড়িতে গাছপালা লাগাতে হবে। হালকা সুগন্ধযুক্ত গাছ এব্যাপারে বেশ উপযোগী। চারিপাশের পরিবেশ সুন্দর করে তোলা বিষণ্ণতা দূর করার দারুণ উপায়।

WebMD, Healthline, Cleveland Clinics e.t.c.