শরীরে কিসের অভাব হলে ঘাম বেশি হয়? Excessive Sweating: Symptoms, Causes & Treatment.
অতিরিক্ত ঘামের সমস্যাকে হাইপারহাইড্রোসিস বলা হয়। এক্ষেত্রে শরীর প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ঘামে। অতিরিক্ত ঘাম আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত করতে পারে এবং বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। এই প্রতিবেদনে অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার কারণ, রোগ লক্ষণ এবং চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা কর হয়েছে।
হাইপারহাইড্রোসিস কী? What is Hyperhidrosis?
আমাদের শরীর দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ঘামকে ব্যবহার করে। হাইপারহাইড্রোসিস মানে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সমাজে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত ঘামের কারণে তারা নিজেকে গুটিয়ে নিতে চায়। শারীরিক দুর্গন্ধ ও পোশাক ভিজে যাওয়ার আশঙ্কায় তারা ব্যবসায়িক ও সামাজিক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকেন। হাইপারহাইড্রোসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দেহে অতিরিক্ত ঘর্মগ্রন্থি থাকে না, কিন্তু ঘাম নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণকারী সিমপ্যাথেটিক নার্ভ অতি-সংবেদনশীল হওয়ার কারণে এই সমস্যা হয়।
হাইপারহাইড্রোসিসের প্রকারভেদ: Types of Hyperhidrosis:
হাইপারহাইড্রোসিস প্রধানত দুই প্রকার, প্রাইমারি ফোকাল হাইপারহাইড্রোসিস এবং সেকেন্ডারি জেনারেলাইজড হাইপারহাইড্রোসিস। ফোকাল হাইপারহাইড্রোসিস হল ত্বকের একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। আমাদের দেহে জিনগত কোন পরিবর্তনের কারণে এটা হয়। এটি একটি বংশগত রোগ। প্রাইমারি হাইপারহাইড্রোসিসের ক্ষেত্রে বগল, হাত, পা, মুখমণ্ডল ইত্যাদি স্থানে ঘামের সমস্যা দেখা যায়।
সেকেন্ডারি জেনারেলইজড হাইপারহাইড্রোসিস হল এমন এক ধরনের অতিরিক্ত ঘাম যা কোন শারীরিক অসুস্থতার কারণে হয়। অনেক সময় কোন ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবেও এই সমস্যা দেখা যেতে পারে। যেমন ডায়াবেটিস ও পারকিনসনস রোগের চিকিৎসা করার সময় এমন হতে পারে। জেনেরালাইজড হাইপারহাইড্রোসিসের ফলে ঘুমন্ত অবস্থায়ও শরীর থেকে ঘাম ঝরতে পারে।
হাইপারহাইড্রোসিসের লক্ষণ: Symptoms of Hyperhidrosis:
হাইপারহাইড্রোসিসের প্রধান লক্ষণ হল অতিরিক্ত ঘাম হওয়া। অতিরিক্ত ঘাম হওয়ার কারণে ত্বক ভিজে যায়, পোশাক ভিজে যায়, গাল ও কপাল থেকে ঘামের ফোটা গড়িয়ে পড়ে। এছাড়া আরও বেশ কিছু সমস্যা যেমন ত্বকে জ্বালা হওয়া, চুলকানি ও প্রদাহ হওয়া ইত্যাদি হতে পারে। অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীরে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়, পায়ের ত্বকে ফাটল ধরে বা চামড়া উঠে যায়। হাইপারহাইড্রোসিসের লক্ষণগুলি ব্যক্তি বিশেষে আলাদা হতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে রোগ লক্ষণের তীব্রতা খুব বেশি হতে পারে। হাইপারহাইড্রোসিস মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলে। ঘামের কারণে রোগী বিব্রত বোধ করে এবং সামাজিক মেলামেশা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়।
ঘাম প্রধানত আমাদের ঘর্মগ্রন্থি একক্রাইন গ্রন্থি থেকে নির্গত হয়। এই গ্রন্থিগুলি আমাদের ত্বকের প্রায় সর্বত্র বিদ্যমান। তবে বগল, পায়ের তলা, হাতের তালু, কপাল, গাল, যৌনাঙ্গ, পিঠের নিচের অংশ ইত্যাদি স্থানে একক্রাইন গ্রন্থির সংখ্যা বেশি থাকে। একারণে শরীরের এই সকল অংশে ঘাম নির্গমন বেশি হয়।
হাইপার হাইড্রোসিসের কারণ: Causes of Hyperhidrosis:
প্রাইমারি হাইপারহাইড্রোসিসের কারণ বংশগত কোন জেনেটিক ত্রুটি। তবে সেকেন্ডারি হাইপারহাইড্রোসিসের সঠিক কারণ সবসময় নির্ণয় করা সম্ভব হয় না। তবে কোন বিশেষ ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে বা কোন রোগ ব্যাধির কারণে এই সমস্যা হতে পারে।
থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত সক্রিয় হলে অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে। হঠাৎ করে অতিরিক্ত ঘাম হাইপোগ্লাইসেমিয়া অর্থাৎ রক্তে সুগারের মাত্রা কমে যাওয়ার কারণে হতে পারে। মেনোপজ বা রজোনিবৃত্তির সময় শরীরে হট ফ্লাশ অর্থাৎ হঠাৎ করে অতিরিক্ত ঘেমে যাওয়ার সমস্যা দেখা যেতে পারে। এছাড়া বেশ কিছু ওষুধ যেমন ব্যথানাশক ওষুধ, মানসিক রোগের ওষুধ, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ ইত্যাদি সেবন করার কারণেও অতিরিক্ত ঘামের সমস্যা দেখা যেতে পারে।
হাইপারহাইড্রোসিসের অন্যান্য সম্ভাব্য কারণগুলি হল উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, স্থূলতা, টিবি, এইচ আই ভি রোগের ইনফেকশন, মাথা বা মেরুদণ্ডে আঘাত লাগা, শরীরে টিউমার বা ক্যানসার ইত্যাদি। এছাড়া মাদকদ্রব্য বা অ্যালকোহল সেবন হঠাৎ করে বন্ধ করে দিলেও অতিরিক্ত ঘামের সমস্যা হতে পারে।
হাইপারহাইড্রোসিস রোগ নির্ণয়: Diagnosis of Hyperhidrosis:
হাইপারহাইড্রোসিস রোগ নির্ণয় করার জন্য রোগের উপসর্গ সম্পর্কে ও রোগের ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। এছাড়া হাইপারহাইড্রোসিস শনাক্ত করার জন্য প্রধানত দুই ধরনের পরীক্ষা করা হয়। এই পরীক্ষাগুলির সাহায্যে ঘামের মাত্রা পরিমাপ করা হয়।
স্টার্চ আয়োডিন পরীক্ষা হল এমন একটি পরীক্ষা যা ঘামের রঙকে বাদামি করে তোলে এবং এই পরীক্ষাটির সাহায্যে হাইপারহাইড্রোসিস শনাক্ত করা হয়। এছাড়া ভ্যাপোমিটার নামক যন্ত্রের সাহায্যে ত্বক ভেদ করে বেরিয়ে যাওয়া জলের পরিমাণ পরিমাপ করা হয়। হাত, পা, বগল, মাথার তালু ইত্যাদি থেকে কী পরিমাণ ঘাম নির্গত হচ্ছে সেটা সঠিকভাবে পরিমাপ করে হাইপারহাইড্রোসিস সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া যায়।
হাইপারহাইড্রোসিসের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা: Treatment and Management of Hyperhidrosis:
এই রোগের চিকিৎসা নির্ভর করে শরীরের কোন অংশ আক্রান্ত হয়েছে, রোগের তীব্রতা কেমন ইত্যাদির উপর। সমস্যা হল এমন কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি নেই যা সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর। তাই, কোন চিকিৎসা পদ্ধতিটি আপনার জন্য সবচেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে, সেটা ঠিক করবেন আপনার চিকিৎসক।
কিছু ঘরোয়া প্রতিকার আছে যার সাহায্যে আপনি হাইপারহাইড্রোসিসের উপসর্গগুলি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। অ্যান্টিপ্রেসপিরেন্ট ব্যবহার করলে সাময়িকভাবে ঘর্মগ্রন্থির কাজ বন্ধ করা যায়, তাই অ্যান্টিপ্রেসপিরেন্ট ব্যবহার করতে পারেন। হাইপারহাইড্রোসিসের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হল অ্যালুমিনাম ভিত্তিক ডিওডোরেন্ট।
ঘন ঘন স্নান করলে, বাতাস চলাচল করে এমন সুতির পোশাক পরলে উপসর্গগুলির উপশম হতে পারে এবং স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেন। টেরি-কট বা পলিয়েস্টারের পোশাক না পড়া ভালো, কারণ এগুলি শরীরের তাপ আটকে রাখে, ফলে ঘাম বেশি হয়।
হাইপারহাইড্রোসিসের চিকিৎসা করার জন্য আপনার চিকিৎসক নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ সেবন করার কথা বলতে পারেন। অ্যান্টিকোলিনারজিক, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, বিটা ব্লকার, আলুমিনাম ক্লোরাইড জেল ইত্যাদি ব্যবহার করার কথা বলতে পারেন। এব্যাপারে অবশ্যই আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন।
সমস্যা সহজে না মিটলে বেশ কিছু বিশেষ ধরনের চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। আয়োনটোফোরোসিস নামক চিকিৎসা পদ্ধতিতে হাত ও পা জলের মধ্যে ডুবিয়ে মৃদু ইলেকট্রিক প্রবাহ চালনা করা হয়। এর ফলে ঘর্মগ্রন্থিগুলির অতিসক্রিয়তা কমে যায়।
স্নায়ুর অতিসক্রিয়তা দূর করার জন্য বটুলিনাম টক্সিন ইনজেকশন প্রয়োগ করলে বেশ কয়েক মাস ঘামের উৎপাদন বন্ধ রাখা সম্ভব হয়। প্রয়োজনে এটি বারবার ব্যবহার করা হয়।
মাইক্রোওয়েভ থেরাপির সাহায্যে ঘর্মগ্রন্থিগুলিকে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে দেওয়া যেতে পারে। সাধারণ চিকিৎসায় কাজ না হলে এই পদ্ধতিতে মাত্র এক ঘন্টায় অতিরিক্ত ঘামের সমস্যা দূর করা সম্ভব।
হাইপারহাইড্রোসিস রোগের তীব্রতা খুব বেশি হলে এবং অন্য চিকিৎসায় কাজ না হলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার করে একটি নির্দিষ্ট স্নায়ু কেটে দেওয়া হয়, ফলে ঘামের উৎপাদন কমে যায়। এছাড়া ঘর্মগ্রন্থিগুলিকে লেজার সার্জারি সাহায্যে বা লাইপোসাকশন পদ্ধতির মাধ্যমে অপসারণ করা যেতে পারে।
