রক্ত পরীক্ষা Blood Testল্যাব টেস্ট Lab Test

T4 টেস্ট কী? কেন করা হয়? রিপোর্ট বুঝবেন কীভাবে? What is a T4 test? Why is it performed? How do you interpret the report?

আপনি কি হঠাৎ ওজন বাড়া বা কমা, দুর্বলতা, চুল পড়া বা হার্টবিট বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যায় ভুগছেন? আপনার চিকিৎসক কি আপনাকে T4 টেস্ট করতে বলেছেন? তাহলে এই প্রতিবেদনটি আপনার জন্যই লেখা হয়েছে। আজ আমরা সহজ ভাষায় জানবো T4 টেস্ট কী, কেন T4 টেস্ট করা হয়, রিপোর্ট কিভাবে বুঝবেন, এবং কখন এটা নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তা ভাবনা করা দরকার।

আমাদের শরীরের কাজ স্বাভাবিক রাখতে থাইরয়েড গ্রন্থির ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে থাইরক্সিন বা T4 হরমোন নিঃসৃত হয়। এই হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন, ওজন নিয়ন্ত্রণ, হার্টবিট এবং মানসিক অবস্থার উপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তাই রক্তে T4 হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক আছে কিনা তা জানা অত্যন্ত জরুরি। এই কারণেই T4 টেস্ট করার প্রয়োজন পড়ে।

থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন থাইরক্সিন বা T4 হরমোন আমাদের শরীরে দুইভাবে উপস্থিত থাকে, প্রোটিনের সাথে আবদ্ধ অবস্থায় এবং মুক্ত বা ফ্রি অবস্থায়। একারণে T4 টেস্ট দুই ধরনের হয়, টোটাল T4 এবং ফ্রি T 4

টোটাল T4 টেস্টে রক্তে থাকা মোট T4 অর্থাৎ প্রোটিনে আবদ্ধ এবং মুক্ত, দুটিই পরিমাপ করা হয়। অন্যদিকে ফ্রি T4 টেস্টে শুধুমাত্র মুক্ত T4 হরমোন পরিমাপ করা হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ফ্রি T4 বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেহে সক্রিয় হরমোনের পরিমাণ নির্দেশ করে।

T4 হরমোন শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। দেহের মেটাবলিজম অর্থাৎ শক্তির ব্যবহার, হার্টবিট নিয়ন্ত্রণ, দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া ওজন নিয়ন্ত্রণ, মস্তিষ্কের কাজ, চুল ও ত্বকের স্বাস্থ্য ইত্যাদিতেও T4 হরমোনের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এই হরমোনের নিঃসরণ কম বা বেশি হলে পুরো শরীরেই প্রভাব পড়ে।

চিকিৎসকেরা সাধারণত T4 টেস্ট করতে দেন, যখন থাইরয়েডের সমস্যার কোনো লক্ষণ দেখা যায় বা TSH রিপোর্ট অস্বাভাবিক আসে। এছাড়া যারা থাইরয়েড চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের এই টেস্ট করতে হয়। গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড কাজ স্বাভাবিক আছে কিনা জানতেও এই টেস্ট করতে হয়।

T4 কম ক্ষরিত হলে যেসকল লক্ষণগুলি দেখা যায় সেগুলি হল, ক্লান্তি, ওজন বেড়ে যাওয়া, ঠান্ডা সহ্য করতে না পাড়া, চুল পড়া, শুষ্ক ত্বক, কোষ্ঠকাঠিন্য, অনিয়মিত পিরিয়ড ইত্যাদি।

T4 এর মাত্রা কম হয় হাসিমোতো থাইরয়ডাইটিস রোগে, দেহে আয়োডিনের অভাব হলে বা থাইরয়েড গ্রন্থি অপারেশন করে বাদ দিলে।

T4 বেশি ক্ষরিত হলে যেসকল লক্ষণগুলি দেখা যায় সেগুলি হল, ওজন কমে যাওয়া, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত ঘাম, নার্ভাসনেস,হাত কাঁপা, বিরক্তি বা অস্থিরতা, অনিয়মিত পিরিয়ড ইত্যাদি।

T4 এর মাত্রা বেশি হতে পারে গ্রেভস ডিজিজ, থাইরয়ডাইটিস ইত্যাদি রোগে। এছাড়া থাইরয়ডের রোগের চিকিৎসা করার সময় ওষুধের ডোজ বেশি হলে T4 এর মাত্রা বেশি হয়।

যারা থাইরয়েডের রোগে ভুগছেন, যারা নিয়মিত থাইরয়ডের ওষুধ খান, যাদের হঠাৎ করে ওজনের পরিবর্তন হয়েছে, যাদের TSH রিপোর্ট অস্বাভাবিক, তাদের এই টেস্ট করা দরকার। এছাড়া গর্ভবতি মহিলাদের এবং যাদের চুল পড়ার সমস্যা হচ্ছে, শরীর দূর্বল তাদের T4 টেস্ট করা উচিত।

এই টেস্টের জন্য বিশেষ কোন প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই, কিন্তু কিছু বিষয় মনে রাখতে হবে।

রক্ত দেওয়ার আগে খালি পেটে থাকা বাধ্যতামূলক নয়, তবে খালি পেটে রক্ত দেওয়া ভালো। নিয়মিত থাইরয়েড ওষুধ খেলে আগে রক্ত দিন তারপর ওষুধ খান। যেসব ওষুধ নিয়মিত খান, সেগুলি সম্পর্কে ডাক্তারকে জানান। জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল বা স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ খেলে জানান। গর্ভবতী হলে অবশ্যই আপনার চিকিৎসককে জানান।

গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় T4 টেস্ট না করাই ভালো, কারণ অসুস্থ অবস্থায় T4 রিপোর্ট ভুল আসতে পারে।

সাধারণত হাতের শিরা থেকে রক্ত সংগ্রহ করা হয়। প্রয়োজনে আঙুল সূচ-বিদ্ধ করেও রক্ত নেওয়া যেতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে পায়ের গোড়ালি থেকে রক্ত নেওয়া হয়।

এই পরীক্ষায় বিপদের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সূচ-বিদ্ধ করার সময় সামান্য ব্যথা হতে পারে, ত্বকের নীচে রক্ত জমে হেমাটোমা হতে পারে।

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে, 

টোটাল T4 এর স্বাভাবিক মাত্রা হল,
5 থেকে 12 µg/dL

ফ্রি T4 এর এর স্বাভাবিক মাত্রা হল,
0.8 থেকে 1.8 ng/dL

গর্ভাবস্থায় ফ্রি T4 এর স্বাভাবিক মাত্রা হল,

প্রথম ট্রাইমেস্টার-এ
0.95 – 1.53 ng/dL

দ্বিতীয় এবং তৃতীয় ট্রাইমেস্টার-এ
0.87 – 1.45 ng/dL

শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী স্বাভাবিক মাত্রা পরিবর্তিত হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক মাত্রা নীচের সারণিতে দেওয়া হল,

T4 এর মাত্রা কম হলে বুঝতে হবে যে, হাইপোথাইরয়ডিজম হয়েছে অর্থাৎ থাইরয়েড গ্রন্থি কম কাজ করছে। দেহে আয়োডিনের অভাব থাকলে বা পুষ্টির অভাব হলে এমন হতে পারে। এছাড়া পিটুইটারি গ্রন্থি রোগাক্রান্ত হলে বা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হলেও T4 এর মাত্রা কম হতে পারে।

T4 এর মাত্রা বেশি হলে বুঝতে হবে যে হাইপারথাইরয়ডিজম হয়েছে অর্থৎ থাইরয়েড গ্রন্থি বেশি কাজ করছে। অতিরিক্ত পরিমাণ আয়োডিন গ্রহণ করলে বা থাইরয়ডের ওষুধ বেশি গ্রহণ করলে T4 এর মাত্রা বেশি হতে পারে। এছাড়া রক্তে প্রোটিনের মাত্রা বেশি হলে বা থাইরয়েড গ্রন্থিতে টিউমার হলেও T4 এর মাত্রা বেশি হতে পারে।

শুধুমাত্র T4 রিপোর্ট দেখে থাইরয়েডের রোগ নির্ণয় করা যায় না। থাইরয়ডের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে T3,T4,TSH এই তিনটি টেস্ট একসাথে টেস্ট করা দরকার। এই তিনটি রিপোর্ট একসাথে দেখলে তবে থাইরয়েডের সঠিক অবস্থা বোঝা যায়।

MedilinePlus, Cleveland Clinic, WebMD, etc.