টি4 টেস্ট: T4 test:
আমাদের শরীরের কার্যকলাপ স্বাভাবিক রাখতে থাইরয়েড গ্রন্থির বিশেষ ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। থাইরয়েড গ্রন্থি হতে ক্ষরিত থাইরক্সিন বা T4 হরমোনের মাত্রা কেন গুরুত্বপূর্ণ সেটা জানতে প্রতিবেদনটি দেখতে থাকুন।
T4 টেস্ট কী? What is a T4 Test?
থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে ক্ষরিত হরমোন থাইরক্সিন বা T4 দুটি রূপে আমাদের দেহে অবস্থান করে। বেশিরভাগ থাইরক্সিন হরমোন প্রোটিন জাতীয় পদার্থের সাথে আবদ্ধ অবস্থায় থাকে এবং কিছু পরিমাণ থাইরক্সিন মুক্ত অবস্থায় থাকে।
যেহেতু শরীরে থাইরক্সিন হরমোন, দুটি রূপে অবস্থান করে, তাই থাইরক্সিনের পরিমাণ পরীক্ষা করার জন্য আলাদা আলাদা ভাবে মোট থাইরক্সিন ও মুক্ত বা ফ্রি থাইরক্সিন পরিমাপ করা হয়। টোটাল T4 টেস্ট করার সময় ফ্রি T4 এবং প্রোটিনে আবদ্ধ T4, দুই-ই পরিমাপ করা হয় এবং ফ্রি T4 টেস্ট করার সময় কেবলমাত্র ফ্রি T4 অর্থাৎ প্রোটিনের সাথে যুক্ত নয় এমন থাইরক্সিন পরিমাপ করা হয়। টোটাল T4 অপেক্ষা ফ্রি T4 বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কখন T4 টেস্ট করতে দেওয়া হয়? When T4 Test is Ordered?
TSH অর্থাৎ থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন রিপোর্ট অস্বাভাবিক হলে বা থাইরয়েড গ্রন্থির অতি-সক্রিয়তা বা অল্প-সক্রিয়তার কোন লক্ষণ দেখা গেলে T4 টেস্ট করতে দেওয়া হয়।
থাইরয়েড গ্রন্থি অতি-সক্রিয় হলে যে সকল লক্ষণগুলি দেখা যায় সেগুলি হল,
হার্ট-বিট বেড়ে যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া, ঘুমের সমস্যা, হাত-পা কাঁপা, দুর্বলতা, চোখের চারিপাশ ফুলে ওঠা ইত্যাদি। মহিলাদের মেনস্ট্রাল পিরিয়ড অনিয়মিত হওয়া, চোখে আলো বেশি লাগা, দেখতে সমস্যা হওয়া, ইত্যাদিও থাইরয়েড গ্রন্থির অতি-সক্রিয়তার কারণে হতে পারে।
থাইরয়েড গ্রন্থির অল্প-সক্রিয়তা লক্ষণগুলি হল,
ওজন বেড়ে যাওয়া, শুকনো ত্বক, কোষ্ঠকাঠিন্য, শীতে কাতর হওয়া, চামড়া ফুলে ওঠা, চুল পড়া, ক্লান্তি এবং মেনস্ট্রাল পিরিয়ড অনিয়মিত হওয়া ইত্যাদি।
যে সকল ব্যক্তি থাইরয়েডের চিকিৎসা করাচ্ছেন, তাদেরও নিয়মিত T4 টেস্ট করার প্রয়োজন হয়। থাইরয়েডের সমস্যা-যুক্ত মহিলারা গর্ভবতী হলে, গর্ভধারণের প্রথম ও শেষ দশায় T4 টেস্ট করতে দেওয়া হয়।
T4 পরীক্ষার আগের প্রস্তুতি: Preparation Before T4 Testing:
কী কী ওষুধ সেবন করছেন সেটা ডাক্তারবাবু এবং ল্যাবরেটরিতে জানান, কারণ বিভিন্ন ওষুধ T4 এর মাত্রাকে প্রভাবিত করে। গর্ভবতী মায়েরা অবশ্যই T4 টেস্ট করার সময় ডাক্তারবাবুকে গর্ভধারণের কথা জানান। যে সকল ওষুধ হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হয়, যেসব ওষুধ সেবন করলে, জন্মনিয়ন্ত্রণের পিল সেবন করলে, স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করলে, অবশ্যই ডাক্তারবাবুকে জানান।
T4 টেস্ট করার আগে অনাহারে থাকার প্রয়োজন পড়ে না। যারা থাইরয়েডের ওষুধ খাচ্ছেন তারা, ওষুধ খাওয়ার আগে রক্ত দিন, তারপর ওষুধ খান। প্রচণ্ড অসুস্থ রোগীদের এই টেস্ট না করাই ভালো, কারণ অসুস্থ অবস্থায় T4 রিপোর্ট ঠিক আসে না। তাই সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত T4 টেস্ট না করাই ভালো।
নমুনা সংগ্রহ করার পদ্ধতি: How is the Sample Collected for Testing?
সাধারণত হাতের শিরা থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আঙুলে সূচ-বিদ্ধ করেও রক্ত সংগ্রহ করা যেতে পারে। তবে হাতের শিরা থেকে রক্ত সংগ্রহ করা বেশি ভালো।
শিশুদের ক্ষেত্রে পায়ের গোড়ালিতে সূচি-বদ্ধ করে রক্ত সংগ্রহ করা হয়।
রক্তের নমুনা সংগ্রহ করার সময় তেমন কোন বিপদের সম্ভাবনা নেই। সূচ-বিদ্ধ করা স্থানে সামান্য ব্যথা হতে পারে, কখনো কখনো হেমাটোমা হতে পারে।
T4 এর নরমাল লেভেল বা স্বাভাবিক মাত্রা: Normal Range of T4:
পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তিদের টোটাল T4 এর স্বাভাবিক মাত্রা হল,
5 থেকে 12 মাইক্রোগ্রাম(mcg)/ ডেসিলিটার। (5 – 12 Micrograms/dL)
ফ্রি T4 বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাই ফ্রি T4 এর নরমাল রেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।
পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তিদের ফ্রি T4 এর স্বাভাবিক মাত্রা হল,
0.8 থেকে 8.8 ন্যানোগ্রাম /ডেসিলিটার। (0.8 – 1.8 nanograms/dL)
গর্ভবতী মহিলাদের প্রতি ট্রাইমেস্টারে ফ্রি T4 এর মাত্রার পরিবর্তন ঘটে।
প্রথম ট্রাইমেস্টারে নরমাল রেঞ্জ হল,
0.95 থেকে 1.53 ন্যানোগ্রাম/ডেসিলিটার
এবং দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টারে নরমাল রেঞ্জ হল,
0.87 থেকে 1.45 ন্যানোগ্রাম / ডেসিলিটার।
শিশুদের ক্ষেত্রে নরমাল রেঞ্জ বয়সের সাথে পরিবর্তনশীল। নীচের তালিকায় বয়স অনুসারে শিশুদের নরমাল রেঞ্জ দেওয়া হল।
| বয়স | স্বাভাবিক মাত্রা |
| <6 দিন | 11 – 32 পিকোমোল |
| 6 – 13 দিন | 11.5 – 28.3 পিকোমোল |
| 14 দিন বা > | 12 – 22 পিকোমোল |
| 1 দিন – 1 মাস | 1.05 – 1.9 ন্যানোগ্রাম/ডেসিলিটার |
| 1 – 12 মাস | 1.09 – 1.35 ন্যানোগ্রাম/ডেসিলিটার |
| 1 – 5 বছর | 1.1 – 1.4 ন্যানোগ্রাম/ডেসিলিটার |
| 6 – 10 বছর | 1.1 – 1.35 ন্যানোগ্রাম/ডেসিলিটার |
| 11 – 14 বছর | 1.03 – 1.3 ন্যানোগ্রাম/ডেসিলিটার |
| 15 – 18 বছর | 1.05 – 1.3 ন্যানোগ্রাম/ডেসিলিটার |
পরীক্ষার ফলাফলের ব্যাখ্যা: What Does The Test Result Mean?
শুধুমাত্র T4 পরীক্ষার ফলাফল দেখে থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়। সম্পূর্ণ ধারণা পেতে T3, T4 ও TSH একসাথে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
T4 পরীক্ষার ফলাফল স্বাভাবিক অপেক্ষা বেশি হলে হাইপারথাইরয়েডিজম অর্থাৎ থাইরয়েড গ্রন্থি অতি-সক্রিয় হয়েছে বলে মনে করা হয়।
এছাড়া রক্তে প্রোটিনের মাত্রা বেশি হলে, বেশি পরিমাণ আয়োডিন গ্রহণ করলে, থাইরয়েডের চিকিৎসা করার ওষুধ বেশি খেলে রক্তে T4 এর মাত্রা বেশি হতে পারে। থাইরয়েড গ্রন্থিতে গর্ভাবস্থা সম্পর্কিত টিউমার হলে বা জার্ম সেল টিউমার হলে T4 এর মাত্রা বেশি হতে পারে।
T4 এর মাত্রা কম হতে পারে সুষম পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ না করলে, অপুষ্টিতে ভূগলে এবং শরীরে আয়োডিনের অভাব হলে। এছাড়া থাইরয়েড গ্রন্থি অল্প-সক্রিয় হলে T4 এর মাত্রা কম হয়। পিটুইটারি গ্রন্থি রোগগ্রস্ত হলে T4 এর মাত্রা কম হতে পারে। অসুস্থ অবস্থায় T4 টেস্ট না করাই ভালো, কারণ অসুস্থ হলে রক্তে T4 এর মাত্রা হ্রাস পায়।
তথ্যসূত্র:
Cleveland Clinic, WebMd, Healthline e.t.c.
