Healthy Lifestyle স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রাখাদ্য ও পানীয় Food & Drinks

কিভাবে ফিরিয়ে আনা যায় গভীর ঘুম? How to Get More Deep Sleep?

প্রতিদিন 7 থেকে 8 ঘণ্টা ঘুমানোর পরও যদি সকালে ক্লান্ত অনুভব করেন, তাহলে সমস্যাটা ঘুমের পরিমাণ নয়। এক্ষেত্রে সমস্যাটা ভালো ঘুম অর্থাৎ গভীর ঘুমের অভাব হতে পারে। ঘুমের মাধ্যমেই আমাদের শরীর ও মন বিশ্রাম নেয় এবং নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে।

এই প্রতিবেদনে আলোচনা করা হয়েছে, গভীর ঘুম আসলে কি, কেন এটা এত গুরুত্বপূর্ণ এবং কিভাবে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গভীর ঘুম ফিরিয়ে আনা যায় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে।

কত সময় ধরে ঘুমাচ্ছেন, সেটার সাথে সাথে ঘুমের মানও খুব গুরুত্বপূর্ণ। শরীর ও মনকে সম্পূর্ণ বিশ্রাম দিতে পারলে তবেই আমরা সতেজ অনুভব করি। আর এজন্যই প্রয়োজন গভীর ঘুম। আমাদের অনেকেরই পর্যাপ্ত ঘুমের গভীর ঘুম হয় না। সারারাত ঘুমানোর পরও যদি ঝিমুনি ভাব বা ক্লান্তি থেকে যায়, তার মানে গভীর ঘুমের অভাব হচ্ছে। শরীর ও মন সুস্থ রাখার জন্য গভীর ঘুমের যথেষ্ট ভূমিকা আছে। তাই গভীর ঘুমের অভাব হলে মানসিক স্বাস্থ্য ও মেজাজের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ঘুমের প্রথম পর্যায়ে আমরা তন্দ্রাচ্ছন্ন হতে শুরু করি অর্থাৎ জেগে থাকা এবং ঘুমিয়ে পড়ার মধ্যবর্তী এক অবস্থায় থাকি। এটি ঘুমের প্রথম ও সংক্ষিপ্ত ধাপ, যা প্রায় পাঁচ থেকে দশ মিনিট স্থায়ী হয়। ঘুমের এই পর্যায়ে শরীর কেঁপে ওঠা বা ওপর থেকে পড়ে যাওয়ার মত অনুভূতি হতে পারে এবং ঘুম সহজে ভেঙে যেতে পারে।

ঘুমের দ্বিতীয় পর্যায়ে শরীর ও মন শান্ত হতে শুরু করে। শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা হ্রাস পায়, হৃৎস্পন্দনের গতি কমে যায় এবং চোখ নাড়াচাড়া বন্ধ হয়ে স্থির হতে শুরু করে। মোট ঘুমের প্রায় 45 থেকে 50 শতাংশ সময় জুড়ে থাকে এই দ্বিতীয় পর্যায়। এই সময় মস্তিষ্কের তরঙ্গের গতি কমে যায়, তবে মাঝে মাঝে হঠাৎ কিছু উদ্দীপনা দেখা দেয়।

ঘুমের তৃতীয় পর্যায়ে হল গভীর ঘুমের পর্যায়। এই পর্যায়ে আমাদের মস্তিষ্কের তরঙ্গ ধীর ও সুনির্দিষ্ট ডেল্টা রিদমে নেমে আসে। এই সময় ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা কঠিন হয়, এমনকি জোরালো শব্দেও ঘুম ভাঙ্গে না। আর এই পর্যায়ে কোনো কারণে ঘুম ভেঙ্গে গেলে কয়েক মুহূর্তের জন্য বিভ্রান্তি বা দিশেহারা বোধ হতে পারে।

ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক 90 মিনিট অন্তর অন্তর ঘুমের একটি বিশেষ পর্যায়ে আসে। এই বিশেষ ধরনের ঘুমের সময় গভীর ঘুমে থাকা সত্ত্বেও মস্তিষ্কে কিছু কার্যকলাপ শুরু হয়। এই সময় আমাদের চোখের পাতা খুব দ্রুত পিটপিট করতে থাকে। শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়ে আসে, হৃৎস্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যায়। এই সময় স্বপ্ন গুলি অনেক বেশি জীবন্ত বলে মনে হয়। 90 মিনিট অন্তর অন্তর সারারাত এই REM ঘুম পুনরাবৃত্ত হয়। সকালের দিকে এই ঘুমের মাত্রা আরও গভীর হয়। আমাদের সুস্থতার জন্য এই REM ঘুম খুব গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম (Circadian Rhythm) ঘুমের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও একই সময়ে ঘুম থেকে উঠলে এই ঘড়ির ছন্দ বজায় থাকে। আমরা জোর করে ঘুমিয়ে পড়তে পারিনা, কিন্তু জোর করে ঘুম থেকে উঠতে পারি। তাই ঘুম থেকে ওঠার সময়টা নির্দিষ্ট করতে পারলে, ঘুমানোর সময়টাও নিয়মের মধ্যে চলে আসে। গভীর ঘুম পেতে হলে অবশ্যই ঘুমানোর নির্দিষ্ট সময় মেনে চলতে হবে। এর ফলে আমাদের শরীরের জৈবিক ছন্দও ভালো থাকবে।

অতিরিক্ত গরমে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। আবার খুব বেশি ঠাণ্ডা থাকলেও শরীরের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই ঘরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখতে পারলে গভীর ঘুমের পরিবেশ তৈরি হয়। অন্ধকার ঘর গভীর ঘুমের জন্য আদর্শ। অন্ধকার, মস্তিষ্কে মেলাটোনিন নামক রাসায়নিকের ক্ষরণ বাড়ায়, ফলে ঘুমের মান ভালো হয়। ঘরের আলো নিভিয়ে দিতে হবে এবং জানালায় পুরোপুরি আলো আটকে দেয় এমন ব্ল্যাক আউট (black out) পর্দা ব্যবহার করতে হবে। এর ফলে ঘর বেশ অন্ধকার ও আরামদায়ক হয়ে উঠবে। এই পরিবেশ গভীর ঘুমের জন্য উপযুক্ত। এছাড়া অতিরিক্ত কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে ঘুমানো কঠিন হতে পারে, তাই জানালায় কাঁচ ব্যবহার করে শব্দের প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। বাইরের শব্দ থেকে বাঁচতে প্রয়োজনে ইয়ার প্লাগ অর্থাৎ কানে দেওয়ার বিশেষ ধরণের ছিপি ব্যবহার করতে হবে।

অনেকেই ঘুমের সময় টিভি বা স্মার্ট ফোন বন্ধ করতে ভুলে যায়। সারারাত টিভি বা মোবাইল চালু থাকলে এর আলো ও শব্দ আমাদের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিতে পারে। ফোনের নোটিফিকেশনের শব্দও ঘুম ভাঙানোর পক্ষে যথেষ্ট। তাই ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলি বন্ধ রাখা দরকার। এছাড়া ঘুমানোর আগে একটানা ফোন স্ক্রল করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ এই অভ্যাস আমাদের মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে তোলে ও ঘুমে বাধা দেয়।

রুটিন মেনে প্রতিদিন শরীর চর্চা বা ব্যায়াম করলে ঘুম ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, শারীরিক কসরত দেহে মেলাটোনিনের মাত্রা বাড়িয়ে এবং মানসিক চাপ কমিয়ে ঘুমের মান উন্নত করে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ব্যায়াম করা উচিত নয়, এক্ষেত্রে ঘুমের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দিনের বেলা ব্যায়াম করুন, তবে ঘুমানোর ঠিক আগে তীব্র-মাত্রার ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকুন।

ভালো ঘুমের জন্য বিছানার ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও আরামদায়ক বিছানায় ভালো ঘুম হয়। অতিরিক্ত নরম বা শক্ত বিছানা গভীর ঘুমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বিছানার আকার ছোট হলেও সমস্যা হয়। একারণে ভালো কোয়ালিটির গদি ও বালিশ ব্যবহার করা দরকার। বেশি মোটা বা পাতলা বালিশেও সমস্যা হতে পারে।

ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল পান করলে REM ঘুমের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং ঘুমের মধ্যে বারবার জেগে ওঠার প্রবণতা বাড়ে। ক্যাফেইনও আমাদের ঘুমের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ক্যাফেইন এক ধরনের উদ্দীপক যা আমাদের মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে, ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। তাই ঘুমানোর বেশ কিছুক্ষণ আগে থেকেই ক্যাফেইন যুক্ত পানীয় পান বন্ধ করা উচিত। তামাকের মধ্যে থাকা নিকোটিনও এক প্রকার উদ্দীপক। একারণে রাত্রে ধুমপান করলে ঘুমের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

ভালো ঘুমের জন্য প্রতিদিন ঘরের বাইরে সময় কাটানোর চেষ্টা করতে হবে। এমনকি আবহাওয়া ঠাণ্ডা থাকলেও বাইরে আলোর সংস্পর্শে কিছু সময় থাকা দরকার। বিশেষ করে সকালবেলা সূর্যালোকে থাকলে শরীরে মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন কমে, ফলে শরীরের জৈবিক সারকাডিয়ান ছন্দ ঠিক থাকে। সরকাডিয়ান ছন্দ ঠিক থাকলে ভালো ঘুমের সম্ভাবনা বাড়ে।

অনিদ্রার অন্যতম প্রধান কারণ হল মানসিক চাপ। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, সম্পর্কের টানা পড়েন, অতীত নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, ঘুমের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এর জন্য দায়ী হল কর্টিসোল নামক এক ধরনের হরমোন। মানসিক চাপ বেশি থাকলে এই কর্টিসোল হরমোনের ক্ষরণ বৃদ্ধি পায়, ফলে ঘুমের চক্রের ব্যাঘাত ঘটে ও ঘুমের সমস্যা হয়। যদিও জীবন থেকে সব ধরনের চাপ পুরোপুরি দূর করা প্রায় অসম্ভব, তবুও ধ্যান, যোগব্যায়াম, প্রাণায়াম ইত্যাদি অভ্যাস গুলি মানসিক চাপ কমাতে পারে। এছাড়া মিউজিক থেরাপি ব্যবহার করলেও উপকার পাওয়া যায়।

ঝর্ণার শব্দ, জলের কলকল শব্দ ইত্যাদি কে পিঙ্ক নয়েজ বলা হয়। এই ধরনের পিংক নয়েজ আমাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ উন্নত করতে পারে। শোবার ঘরে কৃত্রিমভাবে এই ধরনের পিংক নয়েজ ব্যবহার করলে গভীর ঘুমের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

Cleveland Clinic, Healthline, Sleep Foundation etc.