Healthy Lifestyle স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রারোগ ও ব্যাধি Health Conditionল্যাব টেস্ট Lab Test

বছরে একবার কোন টেস্ট গুলি করা জরুরি? Routine Health Check up Test:

“Prevention is better than cure” অর্থাৎ রোগ নিরাময়ের থেকে রোগ প্রতিরোধ করা বেশি ভালো। স্বাস্থ্যই প্রকৃত সম্পদ এটা আমরা ভুলে যায় ও অন্যান্য কাজে সময় নষ্ট করি। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে বেশ কিছু জটিল রোগের হাত থেকে আমরা রক্ষা পেতে পারি। সুস্থ থাকতে বছরে একবার কোন টেস্টগুলো অবশ্যই করা দরকার সেগুলি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। সবশেষে আছে একটি বোনাস টিপস, যা আপনার স্বাস্থ্য পরীক্ষার খরচ অনেকটা কমিয়ে দেবে।

আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পেতে কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট বা CBC টেস্ট করা হয়। এই পরীক্ষার সাহায্যে লোহিত রক্ত কণিকা, শ্বেত রক্তকণিকা, হিমোগ্লোবিন, অণুচক্রিকা বা প্লেটলেট, হেমাটোক্রিট ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করা হয়।

কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট টেস্টের সাহায্যে আমাদের স্বাস্থ্য কেমন আছে সেটা বোঝা যায়। দেহে কোন ইনফেকশন আছে কিনা বা কোন রোগ যেমন অ্যানিমিয়া, ব্লাড ক্যান্সার ইত্যাদি হয়েছে কিনা সেটাও শনাক্ত করা যায়। কোনও রোগের চিকিৎসা নেওয়ার ফলে কতটা উপকার হয়েছে সেটা বুঝে নিতেও এই টেস্ট করা হয়।

ব্লাড সুগার টেস্টের সাহায্যে রক্তের মধ্যে গ্লুকোজের মাত্রা পরিমাপ করা হয়। সাধারণত তিন ধরনের ব্লাড সুগার টেস্ট করা হয়, ফাস্টিং ব্লাড সুগার, পোস্ট প্যারানডিয়াল ব্লাড সুগার এবং হিমোগ্লোবিন A1 C.

সাধারণত ডায়াবেটিস রোগ সনাক্ত করার জন্য এই টেস্ট করা হয়। রক্তের মধ্যে সুগারের মাত্রা বেশি বা কম হলে সেটা বিপদজনক হতে পারে। তাই রক্তের সুগার টেস্ট করে জীবনযাত্রায় কোনও পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কিনা বা চিকিৎসা নেওয়ার দরকার আছে কিনা সেটা বোঝা যায়। যাদের ডায়াবেটিসের কোন লক্ষণ আছে বা ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাদের অবশ্যই প্রতিবছর এই টেস্ট করা উচিত। এছাড়া ডায়াবেটিস রোগীদের চিকিৎসা নেয়ার সময় প্রতিমাসে এই টেস্ট করা দরকার।

লিভার ফাংশন টেস্ট হল এমন এক ধরনের রক্ত পরীক্ষা যার সাহায্যে লিভারের কার্যকারিতা ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। লিভারে কোন রোগ হয়েছে কিনা, লিভার কতটা ভালোভাবে প্রোটিন তৈরি করছে ইত্যাদি জানা যায় এই টেস্টের সাহায্যে। লিভারে সিরোসিস হলে, ফ্যাটি লিভারের সমস্যা হলে বা পিত্ত-থলিতে পাথর হলেও বোঝা যায়। কোন ওষুধ সেবনের কারণে লিভারের ক্ষতি হচ্ছে কিনা সেটা জানতেও লিভার ফাংশন টেস্ট করার প্রয়োজন হয়। লিভার ফাংশন টেস্ট হল বেশ কয়েকটি পরীক্ষার সমষ্টি। পরীক্ষাগুলি হল, অ্যালানাইন ট্রান্সঅ্যামাইনেজ, অ্যাসপারটেট ট্রান্সঅ্যামাইনেজ, অ্যালকালাইন ফসফাটেজ, বিলিরুবিন, অ্যালবুমিন, গ্লোবিউলিন ও টোটাল প্রোটিন, গামা গ্লুটামাইল ট্রান্সফারেজ ইত্যাদি।

রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করে কিডনি ফাংশন টেস্ট করা হয়। এই পরীক্ষার সাহায্যে আমাদের কিডনির স্বাস্থ্য কেমন আছে সেটা সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা পাওয়া যায়। এটি দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। কিডনি রোগ যত তাড়াতাড়ি নির্ণয় করা যায় তত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়। জীবনযাত্রার পরিবর্তন করে ও চিকিৎসার সাহায্যে সহজেই বড় ধরণের জটিলতা থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।

কিডনি ফাংশন টেস্টের মাধ্যমে সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ক্রিয়েটিনিন, ইউরিক অ্যাসিড, ক্লোরাইড, ব্লাড ইউরিয়া, ফসফরাস ইত্যাদি প্যারামিটার পরিমাপ করা হয়।

লিপিড প্রোফাইল টেস্টের মাধ্যমে রক্তের মধ্যে উপস্থিত বিভিন্ন ধরনের চর্বি বা লিপিড যেমন টোটাল কোলেস্টেরল, লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন, হাই ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন, ট্রাইগ্লিসারাইড ইত্যাদি পরিমাপ করা হয়।

এই পরীক্ষার ফলাফল দেখে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বিভিন্ন ধরনের লিপিডগুলির মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হলে ধমনীতে প্লাক জমতে পারে। তাই এই পরীক্ষা করলে ধমনী ও হার্টের স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এছাড়া, লিভারের রোগ, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ বা থাইরয়েডের সমস্যাও বোঝা যেতে পারে।

আমাদের দেহে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে খাইরয়েড গ্রন্থি। থাইরয়েড গ্রন্থি কতটা ভালোভাবে কাজ করছে সেটা জানতে থাইরয়েড প্রোফাইল টেস্ট করা হয়। এই পরীক্ষার সাহায্যে থাইরয়েড গ্রন্থির অতি সক্রিয়তা বা হাইপারথাইরয়ডিজম এবং অল্প সক্রিয়তা বা হাইপোথাইরয়ডিজম রোগ শনাক্ত করা যায়। থাইরয়েড গ্রন্থি আমাদের শরীরের বিপাক, শক্তি উৎপাদন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে, তাই থাইরয়েড প্রোফাইল টেস্ট খুব দরকারি একটা পরীক্ষা। থাইরয়েড প্রোফাইল টেস্টের মধ্যে প্রধানত তিন ধরণের হরমোন পরিমাপ করা হয়, থাইরয়েড স্টিমুলেটিং হরমোন, ট্রাই আয়োডোথাইরোনিন এবং থাইরক্সিন।

থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা ছাড়াও হৃৎস্পন্দন, হজম, ওজন, মেজাজের পরিবর্তন ইত্যাদি শারীরিক প্রক্রিয়ায় কোনও সমস্যা হলেও এই টেস্ট করার প্রয়োজন হয়। এছাড়া গ্রেভস ডিজিজ ও অটোইমিউন রোগ সনাক্ত করতে এই টেস্ট করতে হয়।

মূত্রের রুটিন টেস্ট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই পরীক্ষার সাহায্যে প্রস্রাবের রং, ঘনত্ব, রাসায়নিক ও আণুবীক্ষণিক উপাদান পরীক্ষা করা হয়। মূত্রনালির সংক্রমণ, কিডনির রোগ, লিভারের রোগ, ডায়াবেটিস ইত্যাদি সনাক্ত করতে এই টেস্ট খুব কার্যকরী। এটি একটি সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা কিন্তু অসাধারণ উপকারী।

স্বাস্থ্য সম্পর্কে সার্বিক ধারণা পেতে, পেট ব্যথা, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, প্রস্রাবের রক্ত ইত্যাদির কারণ অনুসন্ধান করতে মূত্রের রুটিন টেস্ট করার প্রয়োজন হয়।

ভিটামিন টেস্ট বলতে প্রধানত ভিটামিন Dভিটামিন B12 টেস্ট করার কথা বলা হয়। ভিটামিন D আমাদের হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষা করে ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা উন্নত করে। ভিটামিন B12 স্নায়ুর কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে ও রক্ত উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেহে ভিটামিন Dভিটামিন B12 এর অভাব হলে বেশ কিছু জটিল সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাই সাধারণ স্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা পেতে ভিটামিন D ও ভিটামিন B12 অবশ্যই পরিমাপ করা দরকার।

এবার আলোচনা করা হল বোনাস টিপস নিয়ে। এতক্ষণ ধরে যতগুলি টেস্টের কথা বলা হয়েছে সবগুলি টেস্ট একসাথে করা বেশ খরচ সাপেক্ষ। তাই বয়স অনুসারে মাত্র কয়েকটি টেস্ট করেও স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

যাদের বয়স 20 থেকে 30 বছরের মধ্যে, তাদের CBC, সুগার এবং ইউরিন টেস্ট করলেই হবে।

যাদের বয়স 30 থেকে 40 এর মধ্যে তাদের CBC, সুগার, লিপিড প্রোফাইল এবং লিভার ফাংশন টেস্ট করলেই চলবে।

তবে যাদের বয়স 40 বছরের বেশি তাদের জন্য কোন ছাড় নেই, সম্পূর্ণ রুটিন হেলথ চেকআপ করতে হবে।

মনে রাখতে হবে যে, হেলথ চেকআপ কোন ভয়ের বিষয় নয়, বরং বড় ধরনের অসুখ থেকে বাঁচার সবচেয়ে সহজ উপায়। তাই অবশ্যই প্রতিবছর হেলথ চেকআপ করান ও সুস্থ থাকুন।

Medline Plus, Johns Hopkins Medicine, WebMd