রোগ ও ব্যাধি Health Condition

প্রস্রাবে ইনফেকশনে: রোগ লক্ষণ, রোগ নির্ণয় ও প্রতিকার। Urinary Tract Infections: Symptoms, Diagnosis and Treatment

ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশন বা মূত্রনালিতে সংক্রমণ অতি সাধারণ একটি সমস্যা। পুরুষ অপেক্ষা মহিলাদের এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশনের লক্ষণ, রোগ নির্ণয় ও প্রতিকার সম্পর্কে জানতে প্রতিবেদনটি পড়তে থাকুন।

ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশন হল মূত্রনালিতে জীবাণুর আক্রমণ। সাধারণত ব্যাকটেরিয়া জাতীয় জীবাণু মূত্রনালিতে ইনফেকশন ঘটায়। তবে ছত্রাক ও ভাইরাসের আক্রমণেও ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশন হতে পারে। মূত্রনালির বিভিন্ন স্থানে জীবাণুর সংক্রমণ ঘটতে পারে। কিডনি, গবিনী, মূত্র-থলি ও মূত্রনালির যে কোন স্থানে জীবাণুর আক্রমণ ঘটতে পারে। সাধারণত মূত্র-থলি ও মূত্রনালিতে সংক্রমণের ঘটনা বেশি দেখা যায়।

মূত্রনালির কোন অংশে জীবাণুর আক্রমণ হয়েছে, তার উপর রোগ লক্ষণ নির্ভর করে। মূত্র-থলী ও মূত্রনালিতে সংক্রমণ হলে যে সকল লক্ষণগুলি দেখা যায় সেগুলি হল –

মূত্র ত্যাগ করার সময় জ্বালা, বারে বারে মূত্রত্যাগের প্রবণতা ও অল্প অল্প প্রস্রাব করা, প্রস্রাব ধরে রাখতেন না পাড়া ইত্যাদি। এছাড়া মূত্রের মধ্যে রক্ত, ঘোলাটে বাদামী রঙের মূত্রত্যাগ, প্রস্রাবের রং কফি বা চায়ের মত হওয়া, প্রস্রাবে উগ্র গন্ধ ইত্যাদি রোগ লক্ষণও দেখা যায়। ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন হলে মহিলাদের তলপেটে ব্যথা এবং পুরুষদের পায়ু-দ্বারে ব্যথা হতে পারে।

গবিনী ও কিডনিতে সংক্রমণ হলে যে সকল লক্ষণ গুলি দেখা যায় সেগুলি হল –

কোমরে ও পিঠে ব্যথা, বিশেষ করে কোমরের দুই পাশে ব্যথা, শীত অনুভব করা, জ্বর, ঝিমঝিম ভাব, বমি ইত্যাদি।

কিডনিতে জীবাণুর আক্রমণ হলে বিপদজনক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে রক্তচাপ কমে যায়, শরীরে আঘাত লাগে এবং জীবনহানিকর অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে।

ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশনের কোন লক্ষণ দেখা গেলে প্রথমে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। ডাক্তারবাবু রোগীর শারীরিক পরীক্ষা করবেন এবং রোগ লক্ষণগুলির সাহায্য নিয়ে রোগ সনাক্ত করবেন।

ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশন নিশ্চিতভাবে সনাক্ত করতে মূত্রের রুটিন টেস্ট এবং মূত্রের কালচার ও সেনসিটিভিটি টেস্ট করার প্রয়োজন হয়। মূত্রের কালচার ও সেনসিটিভিটি টেস্ট করার জন্য বিশেষ যত্ন সহকারে মূত্র সংগ্রহ করার প্রয়োজন হয়।

প্রথমে প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরি থেকে জীবাণুমুক্ত পাত্র নিয়ে আসতে হবে। একদম সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম যে মূত্র ত্যাগ করা হবে, সেই মূত্র সংগ্রহ করতে হবে। মূত্র সংগ্রহ করার আগে কখনো পাত্রটি খোলা চলবে না। প্রথমে সামান্য মূত্র ত্যাগ করতে হবে, এবার পাত্রটি খুলে অল্প কয়েক মিলিলিটার মূত্র পাত্রের মধ্যে সংগ্রহ করতে হবে এবং পাত্রের মুখ বন্ধ করতে হবে। প্রথম অংশ বা শেষ অংশের মূত্র সংগ্রহ করা চলবে না, মধ্যবর্তী মূত্র সংগ্রহ করতে হবে।

মূত্রের রুটিন টেস্ট করার সময় মূত্র সংগ্রহের এত নিয়ম মানার প্রয়োজন পড়ে না, তবে এই পদ্ধতিতে সংগ্রহ করতে পারলে ভালো।

মূত্রের রুটিন টেস্টের সাহায্যে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। কালচার ও সেনসিটিভিটি টেস্টের সাহায্যে, ইউরিনারি ট্রাক্ট ইনফেকশন হয়েছে কিনা সেটা নিশ্চিতভাবে জানা যায়। এমনকি কোন অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে ইনফেকশন সেরে যাবে সেটাও বোঝা যায়।

আপার ইউরিনারি ট্র্যাক্টে ইনফেকশন হলে অর্থাৎ কিডনি বা গবিনীতে ইনফেকশন হলে মূত্র পরীক্ষার সাথে রক্তের কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট এবং ব্লাড কালচার নামক পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়।

বারে বারে ইউরিনারি ট্র্যাক ইনফেকশন হলে সম্পূর্ণ রেচনতন্ত্রের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য আলট্রা সাউন্ড ছবি করতে দেওয়া হয়। এই বিশেষ পরীক্ষাটির নাম, কে ইউ বি আলট্রাসাউন্ড। এক্সরে, সিটি স্ক্যান ও এমআরআই করেও রেচনতন্ত্রের বিভিন্ন অঙ্গের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা যেতে পারে।

একটি ছোট্ট ক্যামেরা কে ইউরেথ্রার মধ্য দিয়ে ব্লাডারে বা মূত্র-থলিতে প্রবেশ করানো হয়। ব্লাডারের ভিতরের বিভিন্ন স্থান পর্যবেক্ষণ করার সাথে সাথে এই পদ্ধতিতে ব্লাডারের অল্প এক টুকরো মাংস তুলে নিয়ে এসে প্রদাহের কারণ নির্ণয় করার চেষ্টা করা হয়। ক্যান্সার হয়েছে কিনা সেটাও দেখা হয়।

মূত্রনালির কোন স্থানে এবং কোন জীবাণুর দ্বারা ইনফেকশন হয়েছে তার উপর চিকিৎসা নির্ভর করে। একমাত্র আপনার ডাক্তারবাবু এব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। বেশিভাগ ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন ঘটে থাকে। ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা ইনফেকশন হলে চিকিৎসা করার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।

কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাস বা ফাঙ্গাসের দ্বারা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন হতে পারে। ভাইরাস দমন করার জন্য অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ ব্যবহার করা হয় এবং ফাঙ্গাস দমন করার জন্য অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ ব্যবহার করা হয়।

ঘরোয়া কোনো পদ্ধতিতে বা ওষুধে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন সারিয়ে তোলা সম্ভব নয়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ মত ওষুধ গ্রহণ করার সাথে সাথে কিছু ঘরোয়া উপায় প্রয়োগ করলে ওষুধের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।

  1. পর্যাপ্ত জল পান: পর্যাপ্ত জল পান করলে বা সামান্য বেশি জল পান করলে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন তাড়াতাড়ি সাড়ে। তাই মূত্রনালিতে ইনফেকশন হলে বেশি জল পান করা উচিত।
  1. প্রস্রাব ধরে না রাখা: প্রস্রাবের বেগ এলেই প্রস্রাব করুন। কখনো প্রস্রাব ধরে রাখবেন না। বারে বারে প্রস্রাব করলে মূত্র-থলীতে ব্যাকটেরিয়া বাসা বাঁধতে বাধা পায়।
  1. ক্যানবেরি: ক্যানবেরি নামক বেরি জাতীয় ফলের রস পান করলে ইউ টি আই সহজে ছড়িয়ে পড়ে না। ক্যানবেরি ফলের রস সরাসরি ইনফেকশন সারিয়া তুলতে না পারলেও ইনফেকশন সারাতে সাহায্য করে। ক্যানবেরির রসে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে এবং অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টি ইনফ্লামেটরি গুণও থাকে।
  1. প্রবায়োটিক: যে সকল ব্যাকটেরিয়া আমাদের উপকার করে তাদের প্রবায়োটিক বলা হয়। বিশেষ করে দই-এর মধ্যে থাকে ল্যাকটোব্যাসিলাস নামক ব্যাকটেরিয়া, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন রোধ করতে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে। একারণে আমাদের জীবনযাত্রা ও খাদ্য তালিকায় নজর দেওয়া প্রয়োজন। স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা ও সুষম পুষ্টিকর খাদ্য আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
  1. ভিটামিন সি: ভিটামিন সি খুব ভালো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন সি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ভিটামিন সি, মূত্রে উপস্থিত নাইট্রেটস জাতীয় উপাদানের সাথে বিক্রিয়া করে নাইট্রোজেন অক্সাইড উৎপন্ন করে। এই নাইট্রোজেন অক্সাইড মূত্রে উপস্থিত ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সাহায্য করে।
  1. ডি ম্যানোজ গ্রহণ:  সবজি ও ফলের মধ্যে ডি ম্যানোজ নামক প্রাকৃতিক সুগার প্রচুর পরিমাণে উপস্থিত থাকে। ডি ম্যানোজ অনেকটা অ্যান্টিবায়োটিকের মত কাজ করে এবং বারে বারে ইউ টি আই হওয়া রোধ করে।
  1. হিটিং প্যাড ব্যবহার: ইউ টি আই হলে তলপেটে ব্যথা হয়। এই ব্যথা কমাতে হিটিং প্যাড ব্যবহার করলে আরাম পাওয়া যায়।
  1. অ্যাপেল সিডার ভিনেগার সেবন: ইউ টি আই-এর ঘরোয়া চিকিৎসায় অ্যাপেল সিডার ভিনিগার কার্যকরী বলে মনে করা হয়। অ্যাপেল সিডার ভিনেগার ইনফেকশন সৃষ্টিকারী জীবাণুর বৃদ্ধি রোধ করে।

এই প্রতিবেদনে মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই রোগের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। যৌনাঙ্গে কোনো উপসর্গ দেখা দিলে বা প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারলে তেমন চিন্তার কিছু নেই, এটা তেমন জটিল কিছু নয়। একজন চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করলে কয়েক দিনের মধ্যেই উপসর্গগুলি দূর হয়ে যাবে। সংক্রমণ থেকে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলুন এবং অ্যান্টিবায়োটিকের পুরো কোর্সটি সম্পন্ন করুন।

Mayo Clinic, Cleveland Clinic, National Kidney Foundation etc.