রক্ত পরীক্ষা Blood Testল্যাব টেস্ট Lab Test

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ফ্যাক্টর টেস্ট কী, কেন এবং কখন রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ফ্যাক্টর টেস্ট করা হয়? (R A Factor Test)

আপনার হাত-পায়ের ছোট ছোট জয়েন্টে ব্যথা হয়? সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর আঙুল শক্ত হয়ে থাকে? অনেকদিন ধরে জয়েন্ট ফুলে আছে? ডাক্তার কি আপনাকে RA Factor Test করতে বলেছেন? তাহলে এই প্রতিবেদনটি অবশ্যই শেষ পর্যন্ত পড়ুন। কারণ আজ আমরা জানব— 

RA Factor Test কী? কেন এই পরীক্ষা করা হয়? কখন ডাক্তার এই পরীক্ষা করতে দেন? রিপোর্ট পজিটিভ বা নেগেটিভ হলে তার অর্থ কী? শুধুমাত্র RA Factor পজিটিভ হলেই কি রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস হয়েছে বলা যাবে?

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা RA হল একটি অটোইমিউন ডিজিজ, এক ধরনের বাত রোগ। এর ফলে— জয়েন্টে ব্যথা হয়, জয়েন্ট ফুলে যায়, জয়েন্ট শক্ত হয়ে যায়, ধীরে ধীরে জয়েন্টের ক্ষয় হতে পারে, এমনকি চিকিৎসা না নিলে স্থায়ী বিকৃতিও হতে পারে।

রিউমাটয়েড ফ্যাক্টর বা RA Factor হল একটি অ্যান্টিবডি অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দ্বারা তৈরি বিশেষ ধরনের প্রোটিন। স্বাভাবিক অবস্থায় অ্যান্টিবডি আমাদের শরীরকে জীবাণুর হাত থেকে রক্ষা করে। কিন্তু কিছু অটোইমিউন রোগে এই অ্যান্টিবডি নিজের শরীরের টিস্যুর বিরুদ্ধেই কাজ করতে শুরু করে। রিউমাটয়েড ফ্যাক্টর এই ধরণের একটি অস্বাভাবিক অ্যান্টিবডি। এই রিউমাটয়েড ফ্যাক্টর আমাদের দেহের অস্থিসন্ধির সুস্থ কোষগুলিকে আক্রমণ করে, অর্থাৎ শরীর নিজেই নিজের ক্ষতি সাধন করে। এর ফলে অস্থি সন্ধি ফুলে যায় ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা হয়। এই রোগকে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বলা হয়।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ফ্যাক্টর রক্ত পরীক্ষার সাহায্যে, রক্তের মধ্যে কতটা রিমাটয়েড ফ্যাক্টর নামক প্রোটিন আছে সেটা পরিমাপ করা হয়। আমাদের দেহের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় সমস্যার কারণে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ফ্যাক্টর বেশি হতে পারে। বিশেষ করে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস নামক বাত রোগে এবং শো-গ্রিন সিন্ড্রোম নামক রোগে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ফ্যাক্টর বেশি হয়।

বেশ কিছু সুস্থ মানুষের দেহেও কোন রোগ লক্ষণ ছাড়াই রিউমাটয়েড ফ্যাক্টর বেশি থাকতে দেখা যায়। আবার রিউমাটয়েড ফ্যাক্টর কম থাকা সত্ত্বেও অটোইমিউন ডিজিজ বা বাতের সমস্যা দেখা যেতে পারে। এই পরীক্ষা একা কোনো রোগ নিশ্চিত ভাবে সনাক্ত করতে পারে না। রোগীর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা এবং অন্যান্য পরীক্ষার রিপোর্ট একসঙ্গে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

রিমাটয়েড আর্থ্রাইটিস নামক রোগের লক্ষণ খুব ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়। প্রথমে এই লক্ষণগুলি সাধারণ জীবাণুর আক্রমণ বলে মনে হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে বারে বারে একই সমস্যা সামনে আসে এবং আমরা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ি। চিকিৎসকেরা সাধারণত কতকগুলি রোগ-লক্ষণ দেখলে এই পরীক্ষা করতে বলেন যেমন,

হাত-পায়ের ছোট জয়েন্টে ব্যথা, সকালে দীর্ঘক্ষণ জয়েন্ট শক্ত হয়ে থাকা, জয়েন্ট ফুলে যাওয়া, শরীরের দুই পাশের একই ধরনের জয়েন্ট আক্রান্ত হওয়া ইত্যাদি। এছাড়া দুর্বলতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, হালকা জ্বর, ওজন কমে যাওয়া, চোখ বা মুখ শুকিয়ে যাওয়া, হজমের সমস্যা ইত্যাদিও দেখা যায়। কখনও কখনও গ্ল্যান্ড ফুলে যাওয়া, চোখ জ্বালা করা, নিঃশ্বাস নেওয়ার সমস্যা, বুকে ব্যথা ইত্যাদি রোগ-লক্ষণ দেখা যায়।

তবে সবথেকে পরিচিত লক্ষণ হল অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, অস্থিসন্ধি ফুলে যাওয়া, জয়েন্ট শক্ত বা নরম হয়ে যাওয়া, জয়েন্টের আকৃতির পরিবর্তন ঘটা ইত্যাদি।

এছাড়া আপনার চিকিৎসক যদি মনে করেন যে, আপনার কোন অটোইমিউন ডিজিজ হয়েছে বা আপনার শো-গ্রিন সিনড্রোম নামক রোগ হয়েছে, সেক্ষেত্রে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস ফ্যাক্টর টেস্ট করতে দিতে পারেন। এছাড়া দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত অবস্থায়ও এই পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে।

কোন বিশেষ প্রস্তুতির প্রয়োজন পড়ে না। পরীক্ষার জন্য রক্তের নমুনা দেওয়ার আগে অনাহারে থাকার প্রয়োজন নেই, আপনি খাবার খেয়েও রক্ত দিতে পারেন। তবে এব্যাপারে আপনার চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলা দরকার।

সাধারণত হাতের শিরা থেকে কয়েক মিলিলিটার রক্ত সংগ্রহ করা হয়। প্রথমে বাহুতে রাবার ব্যান্ডের সাহায্যে একটি বাঁধন দেওয়া হয়, তারপর সিরিঞ্জের সাহায্যে রক্ত সংগ্রহ করা হয়।

রক্তের নমুনা সংগ্রহ করার সময় তেমন কোন বিপদের সম্ভাবনা নেই। সুচ-বিদ্ধ করা স্থানে সামান্য ব্যথা হতে পারে। খুব কম ক্ষেত্রে ত্বকের নীচে সামান্য রক্ত জমে হেমাটোমা, নীলচে দাগ ইত্যাদি হতে পারে। এছাড়া অল্প সময়ের জন্য অস্বস্তি হতে পারে।

R A ফ্যাক্টরের নরমাল লেভেল নির্ভর করে কোন পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং কোন ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা হয়েছে তার উপর। তাই রিপোর্টে দেওয়া Reference Range অনুসরণ করা উচিত। R A ফ্যাক্টরের মাত্রা প্রকাশ করা হয় ইউনিট বা একক হিসাবে অথবা টাইটার হিসাবে। ইউনিট হিসেবে প্রকাশ করলে R A ফ্যাক্টরের নরমাল লেভেল হল;

60 u/mL এর কম।

আর টাইটার হিসেবে প্রকাশ করলে নরমাল লেভেল হল;

1:80 টাইটার পর্যন্ত।

এর বেশি হলে R A ফ্যাক্টর পজিটিভ বলা হয়।

রক্তে স্বাভাবিক অপেক্ষা বেশি পরিমাণ R A ফ্যাক্টর উপস্থিত থাকলে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস হয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে মনে রাখতে হবে, R A ফ্যাক্টর পজিটিভ মানেই নিশ্চিতভাবে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস হয়েছে—এমন নয়।

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগ ছাড়াও বিভিন্ন কারণে R A ফ্যাক্টর পজিটিভ হতে পারে, যেমন— শো-গ্রিন সিনড্রোম, সিস্টেমিক লুপাস, দীর্ঘদিনের ভাইরাল সংক্রমণ, যক্ষ্মা, কিছু দীর্ঘস্থায়ী লিভারের রোগ ইত্যাদি। এছাড়া এন্ডোকারডাইটিস, সারকয়ডোসিস, কিছু ধরণের ক্যান্সার ইত্যাদি রোগেও R A ফ্যাক্টর পজিটিভ হতে পারে। লিভার, কিডনি, ফুসফুস ইত্যাদি অঙ্গ অসুস্থ হলেও R A ফ্যাক্টর পজিটিভ হতে পারে ।  কিছু পূর্ণবয়স্ক সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষেরও RA ফ্যাক্টর পজিটিভ হতে পারে।

অনেকেই ভাবেন রিপোর্ট নেগেটিভ মানেই বাত রোগ নেই। কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ঠিক নাও হতে পারে। অনেক সময় রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগের প্রাথমিক অবস্থায় RA ফ্যাক্টর রিপোর্ট নেগেটিভ হয়। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস রোগে আক্রান্ত বেশ কিছু রোগীর RA ফ্যাক্টর সব সময়ই নেগেটিভ থাকে। এদের সেরোনেগেটিভ রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বলা হয়। তাই শুধুমাত্র RA ফ্যাক্টর রিপোর্ট দেখে রোগ নির্ণয় করা যায় না।

বর্তমানে চিকিৎসকেরা প্রয়োজনে আরও কিছু পরীক্ষা লিখে থাকেন। Anti-CCP অ্যান্টিবডি, ESR, CRP, CBC, ইত্যাদি রক্ত পরীক্ষা করতে হতে পারে। বিশেষ করে Anti-CCP টেস্ট রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস নির্ণয়ে অনেক বেশি নির্ভুল বলে বিবেচিত হয়। এছাড়া X-ray, আলট্রাসাইন্ড, MRI ইত্যাদি করার প্রয়োজন হয়। 

রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস যত তাড়াতাড়ি ধরা পড়বে, চিকিৎসা তত ভালো ফল দেবে। দীর্ঘদিন অবহেলা করলে জয়েন্ট স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন জয়েন্টে ব্যথা বা ফোলা থাকলে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে অবশ্যই রিউমাটোলজিস্ট বা চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

আজ আমরা জানলাম— RA ফ্যাক্টর কী, কেন পরীক্ষা করা হয়, কখন করা হয়, রিপোর্ট কীভাবে বোঝা যায় এবং কেন শুধু RA ফ্যাক্টর দেখে রোগ নিশ্চিত করা যায় না।

MedilinePlus, Cleveland Clinic, Medical News Today etc.