অ্যালার্জি রক্ত পরীক্ষা: উদ্দেশ্য, পদ্ধতি ও ফলাফল | Allergy Blood Test: Purpose, Procedure & Results
ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথেই কি আপনার ক্রমাগত হাঁচি, কাশি বা নাক দিয়ে জল পড়া শুরু হয়? কিংবা ধুলাবালি বা বিশেষ কোনও খাবার খেলেই কি সারা শরীরে চুলকানি, লাল চাকা চাকা দাগ বা রাশ বের হয়?
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ আজ অ্যালার্জির সমস্যায় ভুগছেন। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না—কোন নির্দিষ্ট পদার্থের কারণে আমাদের শরীরে এই প্রতিক্রিয়া হচ্ছে! আর এটি নির্ভুলভাবে জানার সেরা একটি উপায় হল অ্যালার্জি রক্ত পরীক্ষা বা Allergy Blood Test।
এই প্রতিবেদনে আলোচনা করা হয়েছে —অ্যালার্জি ব্লাড টেস্ট কী, IgE অ্যান্টিবডি কীভাবে কাজ করে, বয়স অনুযায়ী এর স্বাভাবিক মাত্রা (Normal Range) কত হওয়া উচিত এবং রিপোর্টে IgE মাত্রা বেশি বা কম আসার আসল কারণ কী, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে।
অ্যালার্জি রক্ত পরীক্ষা বা Allergy Blood Test আসলে কী? What exactly is an allergy blood test?
আমাদের চারপাশে এমন বহু পদার্থ আছে যা সাধারণ মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। কিন্তু এই পদার্থগুলি কারো কারো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা Immune System-কে অতিরিক্ত উত্তেজিত করে তোলে। এই পদার্থগুলোকে বলা হয় ‘অ্যালার্জেন’ (Allergens)—যেমন ধূলিকণা, পরাগ-রেণু, গৃহপালিত পশুর লোম, কিছু নির্দিষ্ট খাবার যেমন চিংড়ি, ডিম, বাদাম, ইত্যাদি।
যখন কোনও অ্যালার্জেন প্রথমবার আমাদের শরীরে প্রবেশ করে, তখন আমাদের ইমিউন সিস্টেম সেটিকে শত্রু মনে করে একটি বিশেষ ধরনের অ্যান্টিবডি তৈরি করে। এই অ্যান্টিবডিটির নাম হল IgE ,Immunoglobulin E। এই IgE অ্যান্টিবডিগুলি তৈরি হয়ে রক্তের মাধ্যমে আমাদের ত্বকের মাস্ট সেল (Mast Cells), ফুসফুস, পৌষ্টিকতন্ত্র এবং রক্তের বেসোফিল (Basophil) কোষের সাথে যুক্ত হয়ে অবস্থান করে।
আসল ঘটনা ঘটে যখন ওই অ্যালার্জেনটি দ্বিতীয়বার আমাদের শরীরের সংস্পর্শে আসে! তখন এই IgE যুক্ত কোষগুলো ভীষণভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়ে এবং রক্তে ‘হিস্টামিন’ (Histamine) নামক রাসায়নিক নিঃসৃত করে। এর ফলেই শুরু হয় অ্যালার্জিক রিয়াকশন—যেমন চুলকানি, ফুসকুড়ি, হাঁচি, কাশি ও শ্বাসকষ্ট।
অ্যালার্জি রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে এই বিশেষ IgE অ্যান্টিবডির মোট পরিমাণ (Total IgE) এবং নির্দিষ্ট অ্যালার্জেনের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া অ্যালার্জেন স্পেসিফিক IgE (Specific IgE) নিখুঁতভাবে পরিমাপ করা হয়।
কখন এবং কেন এই পরীক্ষা করা প্রয়োজন? When and why is this test necessary?
কোন কোন পদার্থে থেকে অ্যালার্জি হচ্ছে, সেটা জানার সবচেয়ে পুরাতন ও প্রচলিত পদ্ধতি হল ত্বকের মধ্যে অ্যালার্জি টেস্ট অর্থাৎ Skin Prick Test করা। কিন্তু এই টেস্টটি সব জায়গায় সহজে উপলব্ধ নয় এবং অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কিছুটা বেদনাদায়ক বা কষ্টদায়ক। তাই এর বিকল্প এবং অত্যন্ত সুবিধাজনক মাধ্যম হিসেবে Allergy Blood Test করা হয়।
যদি আপনার দেহে দীর্ঘদিন ধরে এই সকল রোগ-লক্ষণগুলি দেখা যায়, তবে আপনার অ্যালার্জি টেস্ট করানো অত্যন্ত জরুরি, যেমন-
চর্মরোগ বা ত্বকের সমস্যা: ডার্মাটাইটিস, একজিমা (Eczema), কিংবা গায়ে হঠাৎ লাল চাকা চাকা দাগ হয়ে ফুলে যাওয়া বা আমবাত (Hives)।
চোখ ও নাকের সমস্যা: চোখ লাল হয়ে অনবরত চুলকানো, অতিরিক্ত হাঁচি, নাক দিয়ে জল পড়া বা নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া।
শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা: ঘনঘন কাশি, অ্যাজমা বা হাঁপানির টান।
ত্বকের অস্বস্তি: মুখমণ্ডল বা হাতের ত্বক অতিরিক্ত টানটান হওয়া ও চুলকানি হওয়া।
বিপদজনক লক্ষণ: Danger signs:
কিছু কিছু অ্যালার্জিক রিয়াকশন প্রাণঘাতী হতে পারে! যেমন—হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট হওয়া, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার অনুভূতি, পেটে প্রচণ্ড ব্যথা, অনবরত বমি ও ডায়রিয়া হওয়া। এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যালার্জি রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত।
অ্যালার্জি পরীক্ষার প্রস্তুতি: Preparation for allergy testing:
অ্যালার্জি রক্ত পরীক্ষা করার জন্য বিশেষ কোনও জটিল প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। আপনি বছরের যেকোনো সময়, দিনের যেকোনো মুহূর্তে এই পরীক্ষা করাতে পারেন। খালি পেটে বা খাবার খাওয়ার পরেও রক্তের নমুনা দেওয়া যায়। তবে ল্যাবরেটরি টেকনোলজিস্টদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে—খালি পেটে রক্তের নমুনা দিলে রিপোর্ট তুলনামূলক বেশি নিখুঁত আসে।
রক্তের নমুনা সংগ্রহ: Blood sample collection:
সাধারণত আপনার কনুইয়ের ভেতরের দিকের শিরা (Vein) থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। প্রথমে বাহুতে একটি রাবার ব্যান্ড বাধা হয় এবং এরপর সিরিঞ্জের সাহায্যে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
তবে বর্তমানে প্রযুক্তির কল্যাণে বাজারে এমন কিছু পোর্টেবল অ্যালার্জি টেস্টিং ডিভাইস এসেছে, যেখানে ডায়াবেটিস পরীক্ষার মতো আঙুলের ডগায় সামান্য একটু সূচ ফুটিয়ে রক্তের ফোঁটা নিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটে অ্যালার্জি পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে।
IgE-এর স্বাভাবিক মাত্রা: Normal levels of IgE:
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—রক্তে ইমিউনোগ্লোবিউলিন ই বা IgE-এর স্বাভাবিক মাত্রা অর্থাৎ Normal Level কত হওয়া উচিত?
অ্যালার্জি ব্লাড টেস্ট রিপোর্টে IgE এর পরিমাণ প্রধানত IU/mL (International Units per milliliter), kU/L (Kilo Units per Liter) অথবা ng/mL (Nanogram per Milliliter) এককে প্রকাশ করা হয়।
সাধারণত পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে স্পেসিফিক IgE এর পরিমাণ 0.35 kU/L এর বেশি হলে রিপোর্ট পজিটিভ ধরা হয়। তবে বায়ুবাহিত অ্যালার্জেনের ক্ষেত্রে এটি 0.12 kU/L অতিক্রম করলেই সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত পরীক্ষা পদ্ধতি অনুসারে নরমাল লেভেল সামান্য পরিবর্তনশীল। তাই রিপোর্টে লেখা নরমাল লেভেল মেনে চলা উচিত।
এখন বয়স অনুসারে Ig E এর নরমাল লেভেল নিয়ে আলোচনা করা যাক;
রক্তে IgE-এর স্বাভাবিক মাত্রার তালিকা:
| বয়স (Age) | স্বাভাবিক মাত্রা (Normal IU/mL) |
| 0 – 4 দিন | < 1.5 IU/mL |
| 5 দিন – 1 বছর | < 15 IU/mL |
| 1 – 5 বছর | < 60 IU/mL |
| 6 – 9 বছর | < 90 IU/mL |
| 16 বছরের বেশি (প্রাপ্তবয়স্ক) | 3 – 423 IU/mL (গড় বিবেচনা অনুযায়ী < 100 IU/mL) |
পরীক্ষার ফলাফলের ব্যাখ্যা: Explanation of test results:
অনেকেরই প্রশ্ন থাকে—রিপোর্টে IgE-এর মাত্রা বেশি বা কম আসলে তার মানে কি শুধুই অ্যালার্জি? উত্তর হল: না! শুধু অ্যালার্জি ছাড়াও অন্যান্য বেশ কিছু শারীরিক কারণে রক্তে IgE-এর তারতম্য হতে পারে।
IgE এর মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণসমূহ: Reasons for elevated IgE levels:
যেকোনো তীব্র অ্যালার্জি বা হাঁপানি থাকলে দেহে Ig E এর মাত্রা বেশি হয়। শরীরে পরজীবী বা ক্রিমির সংক্রমণ হলে, অটোইমিউন ডিজিজ যেমন রিউমাটয়েড আর্থাইটিস, লিউপাস কিংবা সিলিয়েক ডিজিজ হলে আমাদের ইমিউন সিস্টেম অতি-সক্রিয় হয়ে পড়ে ও IgE বেড়ে যায়। লিভারের জটিল সমস্যা বা ইনফ্লামেটরি বাওয়েল ডিজিজ (IBD) থাকলে এবং কিছু বিশেষ ধরণের ক্যান্সার—যেমন লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা বা মায়োলোমা হলেও রক্তে IgE-এর পরিমাণ উল্লেখযোগ্য-ভাবে বাড়তে পারে।
IgE এর মাত্রা কমে যাওয়ার কারণসমূহ: Causes of decreased IgE levels:
যখন আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, তখন IgE কমে যেতে পারে। দীর্ঘ দিন ধরে উচ্চ মাত্রায় স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ খেলে বা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে Ig E এর মাত্রা কমে যেতে পারে। কিডনিতে কোনও জটিল সমস্যা থাকলে, দেহে এইচ আই ভি (HIV) জীবাণুর সংক্রমণ হলে, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে ও Ig E এর মাত্রা কম হয়।
তবে মনে রাখবেন, ল্যাব রিপোর্টে IgE এর মাত্রা কম বা বেশি হওয়া মানেই আপনি নির্দিষ্ট কোনও রোগে আক্রান্ত—এমনটা নিশ্চিতভাবে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভুল। রিপোর্টটি নিয়ে একজন বিশেষজ্ঞ অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
