Healthy Lifestyle স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রারোগ ও ব্যাধি Health Condition

প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া (UTI): কারণ, রোগ লক্ষণ ও স্থায়ী প্রতিকার Urinary Tract Infection (UTI): Causes, Symptoms & Treatment

প্রস্রাব করার সময় প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, কিংবা তলপেটে অস্বস্তিকর ব্যথা—এই সমস্যাগুলোর মুখোমুখি আমরা অনেকেই জীবনে কখনো না কখনো হয়েছি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলা হয় ‘ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন’ বা সংক্ষেপে UTI।

বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে এই সমস্যাটি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়, তবে পুরুষরাও কিন্তু এর থেকে পুরোপুরি নিরাপদ নন। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে এটি কিডনি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই বিশেষ প্রতিবেদনে আলোচনা করা হয়েছে, UTI আসলে কী, এর প্রধান লক্ষণগুলো কী কী, কীভাবে সঠিক নিয়মে পরীক্ষা করাতে হয় এবং এটি থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কে।

ইউরিনারি ট্র্যাক্ট হল এমন একটি তন্ত্র বা ব্যবস্থা যেখানে মূত্র উৎপাদিত হয় এবং মূত্রের মাধ্যমে শরীরের বর্জ্য পদার্থ দেহের বাইরে নির্গত হয়। এর অন্তর্ভুক্ত অংশগুলো হল-

বৃক্ক বা কিডনি, গবিনী, মূত্র-থলি এবং মূত্রনালি ইত্যাদি। কিডনি হল শিমের বীজের মতো আকৃতির ছোট অঙ্গ, যা শরীরের পেছনের দিকে কোমরের হাড়ের (হিপ) ঠিক ওপরে অবস্থিত। সাধারণত মানুষের দুটি কিডনি থাকে। এগুলো রক্ত ​​থেকে জল ও বর্জ্য পদার্থ ছেঁকে আলাদা করে, যা পরে মূত্রে পরিণত হয়। আমাদের দেহের সাধারণ বর্জ্য পদার্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিন। 

ইউরেটার বা গবিনী হল সরু নালি যা কিডনি থেকে মূত্র বহন করে মূত্র-থলিতে নিয়ে যায়। মূত্র-থলি হল বেলুনের মতো একটি অঙ্গ যেখানে শরীর থেকে নিষ্কাশিত হওয়ার আগে মূত্র জমা থাকে। ইউরেথ্রা বা মূত্রনালি, মূত্র-থলি থেকে মূত্র বহন করে শরীরের বাইরে নিয়ে যায়।

প্রথমেই জানা যাক, এই ইউটিআই (UTI) আসলে কী? সহজ কথায়, আমাদের মূত্রনালিতে যখন কোনো ক্ষতিকারক জীবাণু প্রবেশ করে এবং সেখানে বংশবৃদ্ধি শুরু করে, তখনই ইনফেকশন বা সংক্রমণ ঘটে। শতকরা 90 ভাগ ক্ষেত্রেই এই সংক্রমণের পেছনে দায়ী ব্যাকটেরিয়া (যেমন: E. coli)। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছত্রাক (Fungus) বা ভাইরাসের কারণেও এটা হতে পারে।

আমাদের রেচনতন্ত্রকে মূলত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:

1) নিম্ন মূত্রনালি: মূত্র-থলি এবং মূত্রনালি।

2) উচ্চ মূত্রনালি: কিডনি এবং গবিনী।

সংক্রমণটি মূত্রনালির কোন অংশে হয়েছে, তার ওপর রোগ লক্ষণ নির্ভর করে এবং চিকিৎসার ধরন বদলে যায়।

মূত্রনালির সংক্রমণ (UTI) কতটা সাধারণ?

মূত্রনালির সংক্রমণ বা ইউটিআই (UTI) অত্যন্ত সাধারণ একটি সমস্যা, বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে। জীবনের কোনও না কোনও পর্যায়ে প্রায় অর্ধেক মহিলাই এই সংক্রমণের শিকার হন। পুরুষ এবং শিশুদেরও এই সংক্রমণ হতে পারে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণের হার মাত্র 1 – 2 শতাংশ।

এবার আসা যাক মূল লক্ষণে। মূত্রনালির নিচের অংশে ইনফেকশন হলে সাধারণত যেসব লক্ষণ দেখা যায় সেগুলি হল-

প্রস্রাব করার সময় প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া বা ব্যথা হওয়া। বার বার প্রস্রাবের অনুভূতি হওয়া, কিন্তু বাথরুমে গেলে সামান্য প্রস্রাব হওয়া। প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারা। প্রস্রাবের রঙ ঘোলাটে, বাদামী, বা চা/কফির মতো হওয়া। প্রস্রাব থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়া।

মহিলাদের ক্ষেত্রে তলপেটে ব্যথা এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে পায়ু-দ্বারের চারপাশে অস্বস্তি বা ব্যথা।

কিন্তু সাবধান! ইনফেকশন যদি কিডনি বা গবিনী পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় (উচ্চ মূত্রনালি), তবে রোগের তীব্রতা বিপজ্জনক রূপ নেয়। সেক্ষেত্রে যেসকল লক্ষণ দেখা যায় সেগুলি হল-

পিঠের পেছনে বা কোমরের দুই পাশে তীব্র ব্যথা। কাঁপুনি দিয়ে দ্রুত জ্বর আসা। বমি বমি ভাব বা ঘন ঘন বমি হওয়া। চরম ক্লান্তি ও ঝিমঝিম ভাব।

কিডনিতে সংক্রমণ হলে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যেতে পারে, যা জীবনহানিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাই এগুলো দেখা দিলে বিন্দুমাত্র দেরি করা যাবে না।

রোগলক্ষণ দেখে সন্দেহ হলে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আপনার চিকিৎসক আপনাকে কিছু পরীক্ষা করতে দিতে পারেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মূত্র পরীক্ষা। কিন্তু আপনি কি জানেন? ভুল নিয়মে প্রস্রাব সংগ্রহ করলে পরীক্ষার টেস্ট রিপোর্ট ভুল আসতে পারে!

ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন সনাক্ত করার জন্য মূত্রের দুই প্রকার টেস্ট করতে দেওয়া হয়, মূত্রের রুটিন টেস্ট এবং মূত্রের কালচার ও সেনসিটিভিটি টেস্ট।

মূত্রের রুটিন টেস্টের জন্য সাধারণত একটি পরিষ্কার কাঁচের পাত্রে প্রায় 100 মিলিলিটার মূত্র সংগ্রহ করতে হয়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম ত্যাগ করা মূত্র সংগ্রহ করা উচিত। সকালের মূত্র সংগ্রহ করা সম্ভব না হলে দিনের অন্য সময়ের মূত্রও ব্যবহার করা যাবে। তবে সেক্ষেত্রে মূত্র সংগ্রহ করার আগে কম করে 4 ঘণ্টা মূত্র ত্যাগ বন্ধ রাখতে হবে। ল্যাবরেটরিতে টেকনিশিয়ানরা মূত্রের একাধিক বিষয় পরীক্ষা করে সংক্রমণের উপস্থিতি যাচাই করেন। মূত্রের রুটিন টেস্টের সাহায্যে মূত্রনালির স্বাস্থ্য ও শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা পাওয়া যায়।

মূত্রের কালচার ও সেনসিটিভিটি টেস্টের জন্য প্রস্রাব সংগ্রহের সঠিক পদ্ধতিটি ভালো করে মেনে চলতে হবে। প্যাথলজি ল্যাব থেকে দেওয়া জীবাণুমুক্ত বা স্টেরাইল (Sterile) পাত্র ব্যবহার করতে হবে। আগে থেকে পাত্রের ঢাকনা খুলে রাখা যাবে না। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম প্রস্রাবটি নিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম— প্রস্রাবের একদম শুরুর অংশ এবং শেষের অংশ বাদ দিয়ে, মাঝখানের অংশটি (Mid-stream urine) পাত্রে সংগ্রহ করতে হবে।

ল্যাব টেকনিশিয়ানরা মূত্রের নমুনায় কোনও ব্যাকটেরিয়া উপস্থিত আছে কিনা, সেটা শনাক্ত করার জন্য পরীক্ষা করবেন। এই পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে 72 ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। ইউরিন কালচার টেস্টের মাধ্যমে জানা যায়, ঠিক কোন ব্যাকটেরিয়ার কারণে ইনফেকশন হয়েছে এবং কোন অ্যান্টিবায়োটিক খেলে তা দ্রুত সেরে যাবে। ইউরিন কালচার খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটা চিকিৎসার পদ্ধতি নির্ধারণ করতে সহায়তা করে।

যদি চিকিৎসায় সংক্রমণের কোনও উন্নতি না হয়, তবে মূত্রনালিতে কোনও রোগ বা আঘাত আছে কি না তা দেখার জন্য আপনার চিকিৎসক নিচের পরীক্ষাগুলো করার পরামর্শ দিতে পারেন:

আলট্রাসাউন্ড হল এক ধরনের ইমেজিং পরীক্ষা যার সাহায্যে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গের মধ্যে কোনও ইনফেকশন আছে কিনা সেটা জানা যায়। আলট্রাসাউন্ড একটি ব্যথামুক্ত প্রক্রিয়া এবং এর জন্য কোনও পূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় না।

সিটি স্ক্যান হল আরেকটি ইমেজিং পরীক্ষা। এটি এক ধরনের এক্স-রে যা শরীরের আড়াআড়ি বা প্রস্থচ্ছেদের ছবি গ্রহণ করে এবং শরীরের ভেতরের 3D ছবি তৈরি করে। সাধারণ এক্স-রের তুলনায় সিটি স্ক্যান অনেক বেশি নিখুঁত তথ্য প্রদান করে।

সিস্টোস্কোপি প্রক্রিয়ায় মূত্রনালির (ইউরেথ্রা) মধ্য দিয়ে একটি সিস্টোস্কোপ প্রবেশ করিয়ে মূত্র-থলির ভেতরটা দেখা হয়। সিস্টোস্কোপ হল একটি সরু যন্ত্র যার এক প্রান্তে লেন্স ও আলো লাগানো থাকে।

যদি আপনার ঘন ঘন ইউটিআই (UTI) হতে থাকে, তবে আপনার চিকিৎসক আরও কিছু পরীক্ষা করার কথা বলতে পারেন। শরীরে অন্য কোনও সমস্যা—যেমন ডায়াবেটিস, রেচনতন্ত্রের অস্বাভাবিক গঠন ইত্যাদি আছে কি না সেটা যাচাই করার জন্য পরীক্ষা করতে পারেন।

যেহেতু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়ার কারণে এই সমস্যা হয়, তাই ডাক্তাররা নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করার পরামর্শ দেন। যদি ফাঙ্গাস বা ভাইরাসের কারণে ইনফেকশন হয়, তবে অ্যান্টিফাঙ্গাল বা অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ দেওয়া হয়।

ওষুধ সেবন করার বিষয়ে একটি বিশেষ সতর্কতা মনে চলতে হবে। অনেকেই 2-3 দিন অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার পর লক্ষণ একটু কমে গেলেই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। এটি একটি মারাত্মক ভুল! এর ফলে ব্যাকটেরিয়াগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে ওষুধ আর কাজ করে না,যাকে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বলা হয়। তাই ডাক্তারের দেওয়া ওষুধের কোর্স পুরোপুরি শেষ করুন।”

ছোটখাটো মূত্রনালির সংক্রমণ কখনও কখনও নিজে থেকেই সেরে যায়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইউটিআই দূরে করতে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ওষুধ সেবন করতে হয়। জ্বর, ঠাণ্ডা, বমি বমি ভাব এবং বমি ইত্যাদি রোগ-লক্ষণ থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ওষুধ খাওয়ার পাশাপাশি কিছু সহজ ঘরোয়া অভ্যাস গড়ে তুললে আপনি ইনফেকশন থেকে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন এবং রোগ প্রতিরোধ করতে পারবেন।

  1. প্রচুর জল পান করুন: দিনে অন্তত 2.5 থেকে 3 লিটার জল পান করুন। এতে ঘন ঘন প্রস্রাবের মাধ্যমে মূত্রনালি থেকে ব্যাকটেরিয়া ধুয়ে বেরিয়ে যায়।
  2. প্রস্রাব আটকে রাখবেন না: প্রস্রাবের বেগ আসার সাথে সাথেই বাথরুমে যান। প্রস্রাব ধরে রাখলে ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধি করার সুযোগ পায়।
  3. প্রবায়োটিক গ্রহণ: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় টক দই বা প্রবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার রাখুন। দইয়ে থাকা ল্যাকটোব্যাসিলাস ব্যাকটেরিয়া শরীরের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বাড়ায়।
  4. ভিটামিন সি ও ডি-ম্যানোজ: ভিটামিন সি যুক্ত ফলমূল এবং ডি-ম্যানোজ সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক শাকসবজি মূত্রকে সামান্য এসিডিক করে তোলে, যা ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সাহায্য করে।
  5. ক্যানবেরি জুস: ক্যানবেরি ফলের জুসে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মূত্রনালির দেয়ালে ব্যাকটেরিয়া আটকে থাকতে দেয় না।
  6. হিটিং প্যাড: ইনফেকশনের কারণে তলপেটে ব্যথা হলে হালকা হিটিং প্যাড দিয়ে সেঁক নিলে দ্রুত আরাম মেলে।”

আশা করি এই প্রতিবেদনটি ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা প্রস্রাবের সংক্রমণ সম্পর্কে আপনার মনের অনেক ধারণাই পরিষ্কার করতে পেরেছে। ঘরোয়া উপায়গুলো উপসর্গ কমাতে সাহায্য করলেও, মনে রাখবেন এগুলো কিন্তু মূল চিকিৎসকের বিকল্প নয়। তাই সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

Cleveland Clinic, Mayo Clinic, National Kidney Foundation etc.