মুখের কালো দাগের কারণ ও প্রতিকারের উপায় Dark Spot on Face: Common Cause and Remedies
ত্বকের কালো দাগ সাধারণত তেমন কোনও চিন্তার বিষয় নয়। তবে সৌন্দর্য রক্ষা করতে আমরা এগুলো দূর করতে চাই। ত্বকের কালো দাগ বা হাইপারপিগমেন্টেশন মূলত অতিরিক্ত মেলানিন উৎপাদনের কারণে হয়ে থাকে। কোনও কারণে ত্বকের মেলানোসাইট কোষগুলি অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে উঠলে মেলানিন উৎপাদন বেড়ে যায়। এর ফলে ত্বকে ছোপ ছোপ কালো দাগ দেখা দেয়। এই প্রতিবেদনে মুখের কালো দাগের কারণ ও প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
মুখমণ্ডলের হাইপারপিগমেন্টেশন বা ত্বকের অতিরিক্ত কালো হয়ে যাওয়া একটি অত্যন্ত পরিচিত এবং জটিল সমস্যা। ত্বকের কোন অংশে মেলানিন বেশি উৎপাদিত হলে ঐ অংশটিকে আশেপাশের ত্বকের চেয়ে বেশি অন্ধকার বা কালো দেখায়। এটা কোনও নির্দিষ্ট রোগ নয়, শরীরের অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক কোনও সমস্যার বহিঃপ্রকাশ।
হাইপারপিগমেন্টেশন কী এবং কেন হয়? What is Hyperpigmentation, and why does it occur?
আমাদের ত্বকের সব থেকে বাইরের স্তর এপিডারমিসের মধ্যে মেলানোসাইট নামক কোষ থাকে। এই কোষগুলি মেলানিন তৈরি করে যা আমাদের ত্বকের রং নির্ধারণ করে। মেলানিনের অন্যতম প্রধান কাজ হল ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করা।
কোনও কারণে এই মেলানোসাইট কোষগুলি অতি-সক্রিয় হয়ে উঠলে এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং মেলানিনের উৎপাদনও বেড়ে যায়। এর ফলে ত্বকে কালো দাগ বা ছোপ দেখা যায়, যাকে হাইপারপিগমেন্টেশন বলা হয়।
সূর্যের আলোর সংস্পর্শ: Sun Exposure:
আমাদের দেহে ভিটামিন ডি-এর উৎপাদনের জন্য সূর্যালোকের সংস্পর্শে থাকা খুব প্রয়োজন। কিন্তু অতিরিক্ত সময় সূর্যালোকে থাকলে ত্বকের ক্ষতি হয় ও ত্বকে কালো দাগ হতে পারে। অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে এলে ত্বকের মেলানোসাইট কোষগুলি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পরিমাণ মেলানিন নিঃসরণ করে। এর ফলে ত্বকের উন্মুক্ত অংশে কালো দাগ বা ছোপ দেখা দেয়।
বয়স বৃদ্ধি: Ageing:
বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ত্বকের স্বাভাবিক গঠন ও কর্মক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। দীর্ঘদিন ধরে সূর্যের আলোর সংস্পর্শে থাকার কারণে মেলানোসাইট কোশের বিতরণ অসম হয়ে পড়ে। এর ফলে বয়স্ক মানুষদের মুখে ছোট ছোট কালো বা বাদামি ছোপ দেখা যায়, যাকে এজ স্পট বা সোলার লেন্টিজাইনস বলে।
গর্ভাবস্থা: Pregnancy:
গর্ভাবস্থায় মহিলাদের দেহে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের মাত্রা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই হরমোনগুলি মেলানোসাইট কোষকে উদ্দীপিত করে। এর ফলে গর্ভবতী মহিলাদের মুখে, বিশেষ করে গালে, কপালে এবং নাকের উপর কালচে ছোপ দেখা দেয়। একে সাধারণত প্রেগন্যান্সি মাস্ক বলা হয়। সন্তান প্রসবের পর হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক হলে এই দাগ নিজে নিজেই হালকা হয়ে যায়।
ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া: Medication Side Effect:
বেশ কিছু ওষুধ আছে যা সেবন করলে ত্বকে দাগ পড়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। আন্টি ইনফ্লামেটরি স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ, কেমোথেরাপির ওষুধ, ম্যালেরিয়ার ওষুধ ইত্যাদি ত্বকে দাগ পড়ার প্রবণতা বাড়ায়। এছাড়া গর্ভনিরোধক বড়ি, কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, ডায়াবেটিসের ওষুধ ইত্যাদিও ত্বকে দাগ সৃষ্টি করতে পারে।
ডায়াবেটিস: Diabetes:
ডায়াবেটিসের কারণে ত্বকের কিছু অংশ কালো হয়ে যেতে পারে। ডায়াবেটিক ডারমোপ্যাথি নামক রোগে পায়ের নিচের অংশে বাদামি বা লাল ছোপ দেখা দেয়। এছাড়া ডায়াবেটিস রোগীদের ঘাড়, বগল ইত্যাদির চামড়ায় কালচে ছোপ ছোপ দাগ দেখা যেতে পারে। এই ছোপগুলি মখমলের মতো নরম হয়।
লিভার বা কিডনি রোগ: Liver or Kidney Disease:
লিভার বা কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীর থেকে টক্সিন বা বর্জ্য পদার্থ ঠিকমতো দেহের বাইরে নির্গত হতে পারে না। এই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার কারণে ত্বকে দাগ পড়ে এবং মুখমণ্ডল কালচে বা নিস্তেজ দেখায়।
পুষ্টির অভাব: Nutritional Deficiency:
শরীরে ভিটামিন বি 12 এর তীব্র অভাব হলে মেলানিন সংশ্লেষণ ব্যাহত হয়। এক্ষেত্রে মুখে ও হাত পায়ের জয়েন্টগুলিতে কালচে ছোপ দেখা দিতে পারে। ফলিক অ্যাসিড এবং আয়রনের অভাব হলে রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া হয় ও ত্বকের উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়। অ্যানিমিয়া হলে অসম পিগমেন্টেশনের কারণে ত্বকে দাগ দেখা যেতে পারে।
ত্বকের ক্যান্সার: Skin Cancer:
ত্বকে ক্যান্সার হলে ত্বকের মধ্যে কালো দাগ বা ছোপ সৃষ্টি হয়। ত্বকে থাকা কোনও দাগ বা তিল ক্যান্সার কিনা তা জানার জন্য দাগটি গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। দাগ বা তিলটির দুই পাশ একই রকম হয় না, কিনারা অমসৃণ, অস্পষ্ট বা খাঁজকাটা হয়। তিলটির রং বা পিগমেনটেশন সব জায়গায় সমান হয়, তামাটে বাদামি বা কালো রঙের বিভিন্ন শেড বা আভা থাকতে পারে।
ত্বকের কালো দাগ দূর করার উপায়: How to Remove Dark Spot?
ত্বকের কালো দাগের জন্য সাধারণত তেমন কোনও চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু সৌন্দর্যের খাতিরে দাগ দূর করতে চাইলে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া দরকার। অনেক সময় কিছু ঘরোয়া প্রতিকার বা চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান হতে পারে।
ঘরোয়া প্রতিকার ব্যবহার করে ত্বকের কালো দাগ না মিটলে বিশেষ ধরনের চিকিৎসা নিতে হয়। বিশেষ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতিগুলি ব্যয়বহুল এবং এগুলিতে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু এই বিশেষ ধরনের চিকিৎসায় দ্রুত ত্বকের কালো দাগ সেরে যায়।
কেমিক্যাল পিল: Chemical Peel:
ত্বকের বিশেষ ধরনের চিকিৎসার জন্য সাধারণত গ্লাইকোলিক অ্যাসিড, ল্যাকটিক অ্যাসিড এবং স্যালিসিলিক অ্যাসিডের মতো উপাদান-যুক্ত ক্রিম ব্যবহার করা হয়। এই উপাদানগুলি ত্বকের স্বাভাবিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে বাড়িয়ে তোলে। এর ফলে পিগমেন্টযুক্ত বা দাগযুক্ত কোষগুলি দ্রুত উপরে উঠে আসে ও ত্বক থেকে ঝরে যায়। এছাড়া এই উপাদানগুলি ত্বকের অন্যান্য দাগ দূর করতেও সাহায্য করে।
লেজার ট্রিটমেন্ট: Laser Treatment:
মুখের দাগ কমানোর একটি কার্যকরী উপায় হল লেজার ট্রিটমেন্ট। ত্বকের হাইপারপিগমেন্টেশন বা কালো দাগ হালকা করার জন্য অত্যাধুনিক লেজার আলো ব্যবহার করা হয়। লেজারের সাহায্যে মেলানিনের পরিমাণ কমিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে লেজারের চিকিৎসায় ত্বক ফর্সা হওয়ার পরিবর্তে আরও কালো হয়ে যেতে পারে, তাই একজন প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।
মাইক্রোডার্মাব্রেশন: Microdermabrasion:
এই পদ্ধতিতে চিকিৎসক ত্বকের উপরের অংশটি ঘষে অপসারণ করেন। ত্বকের উপরের অংশ তুলে ফেলার জন্য একটি বিশেষ ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করা হয়।এই চিকিৎসা নেওয়ার ফলে ত্বকে কোলাজেনের উৎপাদন বাড়ে এবং ত্বকের দাগ-ছোপ কমে যায়।
ক্রায়োথেরাপি: Cryotherapy:
ক্রায়োথেরাপি হল এমন একটি পদ্ধতি যেখানে ত্বকের কালো দাগগুলির উপর তরল নাইট্রোজেন প্রয়োগ করা হয়। এর ফলে ত্বকের ঐ নির্দিষ্ট কোষগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ত্বক সেরে ওঠার সময় সাধারণত আগের থেকে অনেক বেশি সমান ও সুষম রঙের হয়ে ওঠে।
ত্বক ফর্সাকারী ক্রিম: Skin-lightening Cream:
ত্বককে ব্লিচ বা ফর্সা করার জন্য আপনার চিকিৎসক বিশেষ ধরনের ক্রিম ব্যবহার করার পরামর্শ দিতে পারেন। এগুলির মধ্যে সাধারণত হাইড্রোকুইনোনের মত ত্বক ফর্সাকারী উপাদান থাকে। এছাড়া এসব ক্রিমে ট্রপিক্যাল স্টেরয়েড বা ট্রপিক্যাল রেটিনয়েড ইত্যাদি থাকতে পারে। এই সকল উপাদান মেলানিন উৎপাদনে বাধা দেয়।
